x

এইমাত্র

  •  নাসিরপুরের ‘জঙ্গি আস্তানা’ থেকে ১১ জন আটক

কেরুজ চিনিকলে ১১ হাজার কোটি টাকার মুনাফা

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৭, ১৬:১১

শামসুজ্জোহা পলাশ

চুয়াডাঙ্গা তথা এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি কেরুজ চিনিকল। যা দর্শনা চিনিকল হিসেবে পরিচিত। ওষুধ, চিনি, মদ ও কৃষি খামার নিয়ে গড়ে তোলা কেরুজ এশিয়া মহাদেশের ২য় বৃহত্তম ও বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তম ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির রয়েছে সোনালী অতিত ঐতিহ্য রয়েছে। 

৭৯ বছরের পুরাতন এ মিলটি সম্প্রতি আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। ডিস্টিলারী কারখানাটিরও ব্যপক পরিবর্তন অসছে অচিরেই। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মিলের রাজস্ব ও লোকসানের সঠিক হিসেব কেউ দিতে না পারলেও ধারণা করা হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে মিলটিতে ৫০-৬০ কোটি টাকা লোকসান হলেও মুনাফা অর্জন হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

সম্প্রতি ২ অর্থ বছরে মুনাফা অর্জনের পরিমাণ একেবারেই কম। কেরুজ চিনিকলে প্রতিবছর লোকসান গুনতে হলেও এর ডিস্টিলারী বিভাগের লাভের টাকায় চিনিকল কারখানার মোটা অঙ্কের লোকসান পোষাতে হয় প্রতি বছর। এছাড়া লোকসান গুণতে হয় খামারগুলোতেও। বাংলাদেশের শিল্প স্থাপনাগুলোর মধ্যে কেরুজ চিনিকল একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান।

চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদ দর্শনায় ওষুধ ফ্যাক্টরী, চিনিশিল্প, ডিস্টিলারী ও বাণিজ্যিক খামারের সমন্বয়ে এ বৃহত্তর শিল্প কমপ্লেক্সটি প্রতিষ্ঠিত।

১৮০৫ সালে মি. জন ম্যাক্সওয়েল নামক এক ইংরেজ তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতের কানপুরে জাগমু নামক স্থানে একটি মদের কারখানা চালু করেন। সময়ের বিবর্তনে নাম, স্থান, মালিকানা, উৎপাদন ও ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হতে থাকে। ১৮৪৭ সালে মি. রবার্ট রাসেল কেরুর সাথে অংশিদারিত্বে যুক্তহন।

কিছুদিনের মধ্যে মি. রবার্ট রাসেল তার অংশ বিক্রি করে দেন। ১৮৫৭ সালে ভারতের রোজতে সিপাহী বিপ্লবের সময় প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতঃপর তা পুন:নির্মান পূর্বক জয়েন্ট স্টক কোম্পানি গঠন করে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লি. হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ করা হয়। রোজতে ব্যাবসায় উন্নতি লাভ করলে আসানসোল ও কাটনীতে এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৩৮ সালে প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১ হাজার টন আখ মাড়াই ও ১৮ হাজার প্রুফ লিটার স্পিরিট তৈরির লক্ষ্যে আরও একটি শাখা তদানিন্তন নদীয়া জেলার অন্তর্গত এই দর্শনায় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের পর এটি পরিণত হয় শত্রু সম্পত্তিতে। ১৯৬৮ সালে কেরু অ্যান্ড কোং (পাকিস্থান) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইপি আই ডিসি’র ওপর ন্যাস্ত করার সরকারি প্রচেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অকার্যকর হয়ে যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয় এবং তখন থেকে অদ্যবদি এটি কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লি. নামে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে চিনি, রেকটিফাইড স্পিরিট, দেশীমদ, বিলাতী মদ (জিন, হুইস্কি, রাম, ব্রান্ড, ভদকা) ও ভিনেগার উৎপাদন করা হয়ে থাকে।

অপরদিকে চিটাগুড়, ব্যাগাস ও প্রেসমাড উপজাত দ্রব্য কাজে লাগাতে বছর দুয়েক আগে কেরুজ চিনিকলের আরও একটি শাখা বাড়ানো হয়েছে। কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব জমিতে স্থাপন করেছে জৈব সার কারখানা। এই সার কারখানার প্রধান কাচামাল হচ্ছে চিনিকল ও ডিষ্টিলারীর চিটাগুড়, ব্যাগাস ও প্রেসমাড।

১৯৩৮ সালে চিনি কারখানা স্থাপনের সময় এর যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে ইংল্যান্ডের মেসার্স ব্লেয়ার্স লি. ও গ্লাসগো প্রতিষ্ঠান। সে সময় বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয় ১১ হাজার ৫শ মে. টন। অপরদিকে ডিস্টিলারী কারখানায় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে ফ্রান্সের মেসার্স পিনগ্রিসইটি মোলেট।

এ প্রতিষ্ঠানে জমির পরিমাণ খামার ৩ হাজার ৩শ ৩৫ দশমিক ৫৬ একর। কারখানা ও কলোনি ১৬৬ দশমিক ১৮ একর জমিতে। ইক্ষুক্রয় কেন্দ্র ৫ দশমিক ৩০ একর জমিতে। নিজস্ব সড়কের জমির পরিমাণ ৪৮ দশমিক ৩৫ একর ও শ্মষান ১ দশমিক ২৭ একর। আকন্দবাড়িয়া জৈব সার কারখানা ২৭৯ দশমিক ৭২ একর জিমর ওপর। ৯ বাণিজ্যিক খামারের মধ্যে রয়েছে হিজলগাড়ি, বেগমপুর, ফুরশেদপুর, ঝাঝরি, আড়িয়া, ফুলবাড়ি, ছয়ঘরিয়া, ঘোলদাড়ী ও ডিহিকৃষ্ণপুর। 

এ প্রতিষ্ঠানে জনবল রয়েছে ৫২ অফিসার ও স্থানীয় এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪শ জন। কেরুজ চিনিকলটি আধুনিয়কায়নের কাজ সম্পন্ন হলে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা কমতে পারে। তবে আধুনিকায়নের কার্যক্রম শেষ হতে লাগতে পারে আরও বছর দুয়েক।

অপরদিকে কৃষি খামারের সংখ্যা ১০, ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা মিলগেটে ২, রোড ভিত্তিক ৩৩। দেশব্যাপী দেশি মদবিক্রয় কেন্দ্র ১৩ ও ফরেন লিকার বিক্রয় কেন্দ্র ৩। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরুজ চিনিকলের আয়-ব্যায়ের সঠিক হিসেব জানা না গেলেও, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কেরুজ চিনিকলের সবকটি বিভাগের সমন্বিত হিসেব অনুযায়ী গত ৪৫ বছরে মুনাফা অর্জন করেছে সাড়ে ১১ হাজার কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা। কয়েক বছর ধরে মিলের চিনি কারখানা ও খামারগুলো থেকে লোকসান হলেও তা পুষিয়ে দেয়া হয়ে থাকে ডিস্টিলারী কারখানায় উৎপাদিত দেশী বিদেশী মদ বিক্রির উপার্জনের টাকায়। 

সম্প্রতি সময়ের হিসেব অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থ বছরে কেরুজ কমপ্লেক্স থেকে ৫৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সরকারকে রাজস্ব দিয়েও মুনাফা অর্জন হয়েছে ১৩ কোটি ৮৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ১০-১১ অর্থ বছরে ৬১ কোটি ৩২ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে দিয়েও লাভ হয়েছে ১৫ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ২০১১-১২ অর্থ বছরে মুনাফা অর্জন হয়েছে ২০ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এ অর্থ বছরের সরকারকে রাজস্ব দেয়া হয়েছে ৬৭ কোটি ৭২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে সরকারের রাজস্ব খাতায় ৬৯ কোটি ৪০ টাকা জমা দিয়েও মুনাফা অর্জিত হয়েছে ২২ কোটি ৩২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সরকারের রাজস্ব খাতে জমা দেয়া হয়েছে ৭১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। মুনাফা অর্জন হয়েছে ১৩ কোটি ৯৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা। স্মরণকালে কম মুনাফা অর্জন হয়েছে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে। হিসেব অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে  মুনাফা অর্জন হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা। সরকারকে রাজস্ব দেয়া হয়েছে ৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মুনাফা অর্জন হয়েছে মাত্র ৫ কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। রাজস্ব দেয়া হয়েছে ৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম আরশাদ হোসেন বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি পক্ষ থেকে সামাজিক উন্নয়নে অর্থ বরাদ্ধ দিয়ে থাকে। তার মধ্যে রয়েছে ১ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১ হাফেজিয়া মাদরাসা, সুগার সেচ ও রোড ডেভলপমেন্ট ফান্ড হতে মিলজোন এলাকাতে চাষিদের ইক্ষু পরিবহনের সুবিদার্থে এলাকার রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ ও মেরামতে অর্থ দেয়া। শিক্ষা সেচ তহবিলের আওতায় এলাকার স্কুল কালেজ ও মাদরাসার উন্নয়নের জন্য আর্থিক অনুদানও প্রদান করা হয়ে থাকে। শ্রমিক ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে একটি ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপালাত। সবকিছু মিলিয়ে এলাকায় অর্থসামাজিক উন্নয়নের চালিকা শক্তি হিসেবে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের মূল্যবান সম্পদ কেরুজ চিনিকলটি টিকিয়ে রাখতে বেশি বেশি আখচাষের কোনো বিকল্প নেই। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত