সেই জায়গাটা আমাদের এখনো সুস্থ হয়নি

প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৮:০৬

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমার কাছে কি অর্থ বহন করে? ১৯৭১এ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের একটু আগে আলবদর আর পাকিস্তানি বাহিনী কয়েকজন মাস্টার ডাক্তার সাংবাদিক ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছিল- ব্যাস? এইটুকুই? না। তিরিশ লক্ষ মানুষকে মেরেছে ওরা- তিরিশ লক্ষ শহীদের সাথে আর কয়েকজন লোক যুক্ত হয়েছে মাত্র ব্যাপারটা এরকম না। এই যে কয়েকজন মানুষকে ওরা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে হত্যা করেছে সেটা নিতান্ত কয়েকজন মানুষকে হত্যা করার ব্যাপার ছিল না। সেটা ছিল এই জাতির রাজনৈতিক দর্শন বা পলিটিক্যাল ফিলসফি যারা নির্ধারণ করবে তাঁদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা। অন্যভাবে বললে ওরা চেয়েছিল বাঙালি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে চায়, হোক, কিন্তু যে চেতনায় দেশটা স্বাধীন হচ্ছে সেই চেতনার নির্দেশনা বা ডাইরেকশনটা যেন ভবিষ্যতে ঠিক না থাকে সেটা নিশ্চিত করা।

এই কাজটা করা ওদের জন্যে জরুরী ছিল। কারণ বাঙালির পলিটিকাল ফিলসফি যদি বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ থাকে তাইলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে একটা আলাদা রাষ্ট্র রেখেও চেতনার দিক দিয়ে আরেকটা পাকিস্তান বানানো ওদের জন্যে সহজ হয়ে যাবে। আর এর জন্যে দরকার ছিল ঐসব মাস্টার কবি সাংবাদিক ডাক্তার এদেরকে মেরে মেরে ফেলা। লক্ষ্য করবেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেই ওরা এদেরকে হত্যা করেনি। বা ডাক্তার বলে বা সাংবাদিক বলেই নয়। এদের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানের কারণেই এদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এইটা ছিল ওদের জন্যে সামরিক যুদ্ধের চেয়েও বড় যুদ্ধ।

একটা দেশের রাজনৈতিক দর্শন কি হবে এই প্রশ্নটা আমাদের এখানে অনেকেই গুরুত্বহীন মনে করেন। অনেককেই বলতে শুনবেন, আপাতদৃষ্টিতে বুদ্ধিমান শিক্ষিত লোকজনকেও বলতে শুনেছি, ‘রাখেন ভাই এইসব থিওরি ফিওরি, মানুষের পেটে ভাত থাকাটাই আসল কথা।’ এরা ভুল বলেন। অনেকে জেনে বুঝেই ভ্রান্তিটা ছড়াতে চান। বেশীরভাগ মানুষ না বুঝেই এই কথাটা বলেন। কারণ রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক সংস্থা। আর রাজনৈতিক সংস্থা বলেই প্রতিটা রাষ্ট্রের একেকটা মৌলিক রাজনৈতিক চরিত্র থাকে। আর এই রাজনৈতিক চরিত্রই রাষ্ট্রের প্রতিটা কর্মকাণ্ডের নিয়ামক নীতিমালা হিসাবে কাজ করে।

হেনরিখ হাইনের নাম তো শুনেছেন। জার্মান কবি। দেড় শতকেরও আগে তিনি ফরাসীদেরকে সাবধান করেছিলেন যেন রাজনৈতিক এবং দার্শনিক আইডিয়াকে অবহেলা না করে। এইসব আইডিয়াকে হেলা করবেন না, প্রফেসর সাহেবদের নিস্তরঙ্গ স্টাডিরুমে বিকশিত হওয়া একটা আইডিয়া একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। হাইনে উদাহরণ দিয়েছিলেন কান্ট আর রুশোর কাজগুলির। তার কোথায় কান্টের ক্রিটিক অব পিউর রিজনই সেসময়ের জার্মান দর্শনের কল্লা কেটেছিল আর রুশোর কাজকে তিনি বলেছিলেন রোবোস্পিইয়েরের হাতে রক্তমাখা তরবারি, যেটা দিয়ে সেই ফ্রেঞ্চ উকিল পুরনো রাজতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিল।

এই যে আইডিয়া বা রাজনৈতিক দর্শন বা মতবাদ এইসব দৃশ্যত নিরীহ ইন্টেলেকচুয়াল এক্সারসাইজ, যেসবকে অনেক সময় আপনারা তুচ্ছ অপ্রাসঙ্গিক থিওরি ফিওরি বলে অবহেল করেন, এইসবের গুরুত্ব আমাদের শত্রুরা ঠিকই বুঝত। ওর বুঝতে পেরেছিল কারণ ওরা একটা পশ্চাৎপদ বাতিল বিশ্বাস ও দর্শনকে অবলম্বন করে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। ওরা জানতো- ওদের সেই বাতিল বিশ্বাস ও দর্শনের অভিজ্ঞতা ওদেরকে এই শিক্ষা দিয়েছিল, যে নতুন আইডিয়া, লিবারেল শিক্ষা, প্রগতিশীল চিন্তা ওর মুক্ত চিন্তার যদি এইখানে বিকাশ হয় তাইলে আমাদের এই ভূমি ওদের চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যাবে।

রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে ওরা হারছিল সেটা তো ডিসেম্বরে দৃশ্যমানই ছিল- কিন্তু ওরা যদি এইসব লোককে হত্যা না করে তাইলে ভবিষ্যতে যে ওরা আবার ফেরার চেষ্টা করবে সে রাস্তাও বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্যে অর্থাৎ কিনা ওদের ভবিষ্যতের রাস্তা খোলা রাখার জন্যেই ওদের জনী জরুরী ছিল সেইসব লোককে হত্যা করা যারা সামনের দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগাটাকে অগ্রসর করতে পারে। এরকম যাদেরকে ওরা পেয়েছে ঢাকায় বা অন্যত্র ওদের আয়ত্বের মধ্যে তাঁদেরকেই ওরা হত্যা করেছে, যতজনকে পারে।

এই কারণেই বুদ্ধিজীবী হত্যা যুদ্ধে তিরিশ লাখ মানুষের মৃত্যুর মধ্যেও একটা আলাদা ঘটনা। এটা ছিল আমাদের কালেক্টিভ ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটির উপর আক্রমণ বা আমাদের সামষ্টিক মেধার উপর আক্রমণ। এবং আমাদের শত্রুরা যে ওদের লক্ষ্যে অনেকাংশে সফল ছিল সেকথা আজকে মানতেই হচ্ছে। যে জায়গাটায় ওরা আমাদেরকে আহত করেছিল, সেই জায়গাটা আমাদের এখনো সুস্থ হয়নি। এই কথাটা উপলব্ধি করা না পর্যন্ত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন কেবল একটা শোক দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতাই থেকে যাবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত