x

এইমাত্র

  •  নাসিরপুরের ‘জঙ্গি আস্তানা’ থেকে ১১ জন আটক

২৯ বছরেও মুক্ত হয়নি ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৬, ১১:৫৬

১০ নভেম্বর, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে একটি স্মরণীয় দিন। এই দিন গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে মিছিল করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিল শহীদ নূর হোসেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি গণতন্ত্রের এই সাহসী সৈনিককে। ১৯৬১ সালে ঢাকার নারিন্দায় নূর হোসেনের জন্ম। বাবা মুজিবর রহমান। পেশায় স্কুটার চালক। স্বাধীনতার পর থেকেই নূর হোসেন ও তাঁর পরিবার বনগ্রাম রোডের ৭৯/১ বাড়িতে থাকতেন। 

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা বিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী চলাকালে এক জীবন্ত পোস্টার হিসেবে মিছিলের সামনেই ছিলেন নূর হোসেন। বুকে লেখা ছিল “স্বৈরাচার নীপাত যাক” ও পিঠে লেখা “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” মিছিল কিছুটা এগিয়ে গেলে সেই মিছিলের উপর শুরু হয় এরশাদের পেটুয়া পুলিশ বাহিনীর গুলিবর্ষণ। নূর হোসেনের বুক গুলি ভেদ করে। রক্তাক্ত হয় ঢাকার রাজপথ। লুটিয়ে পড়ে সাহসী সন্তান নূর হোসেন। ক্লাস নাইনে পড়া সুমন নামের এক কিশোর গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে রিকশায় তুলে নিয়েছিল হাসপাতালে নেওয়ার জন্য, রিকশায় টেনে তোলার সময়ও তিনি বলছিলেন ‘আমার কিচ্ছু অয় নাই, তোরা মিছিলে যা, স্বৈরাচারকে আইজ যাওন লাগবোই’! 

রিকশাটা গোলাপ শাহ মাজারের কাছে আসতেই পুলিশের কয়েকটা গাড়ি এসে ঘিরে ফেলে তাদের। কিশোর সুমনের কলার ধরে পুলিশরা তাকে টেনে রিকশা থেকে নামিয়ে নূর হোসেনকে টেনে হিচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আর তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

গভীর রাতে আরো দু’জন শহীদের সাথে জুরাইন কবরস্থানে মাটিচাপা দেয়া হয় নূর হোসেনকে। কবর লুকাতে চুপিসারে তাকে জুরাইন গোরস্থানে কবর দিয়েছে স্বৈরাচার! জুরাইন গোরস্থানে গেলে সে কবরের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি স্বৈরাচারের পুলিশ! সেই ১০ নভেম্বরের পরপর ঈদের কারণে আর হাসিনা-খালেদার ঝগড়ায় আন্দোলনের বিরতি আসে! এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ও এমন মাঝে মাঝে দুই নেত্রীর ঝগড়া লেগে যাচ্ছিলো! ঝগড়া থামাতে মাঠে নেমেছিল ইনু-মেননদের বামপন্থী পাঁচদলীয় জোট!

স্বৈরাচার এরশাদ ও তার দোসররা সেদিন, জীবন্ত নূর হোসেনের থেকে বেশী ভয় পেয়েছিল তাঁর লাশকে! আর সে কারণেই তারা গুম করতে চেয়েছিল শহীদ নূর হোসেনকে। মাটিচাপা দিয়েছিল রাতের আধাঁরে শহীদ নূর হোসেনকে। কিন্তু স্বৈরাচারের এহেন কার্যক্রম, দমিয়ে রাখতে পারেনি সাড়া দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে। তাই নূর হোসেনকে হত্যার পর সাড়া দেশে জেগে উঠেছিল হাজার হাজার নূর হোসেন। আন্দোলনের দাবানল স্ফুলিংগের মত ছড়িয়ে পড়েছিল সাড়া দেশে। পতন ঘটেছিল স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের। মুক্তি পেয়েছিল গণতন্ত্র।

আজ শহীদ নূর হোসেন আত্মত্যাগ নিয়ে শুরু হয়েছে দলীয়করণ। নূর হোসেন যে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন মানুষ ভুলে গেছে সেই গণতন্ত্রের অর্থ। আজ সেই দিনটির কথাই বা ক’জনের মনে আছে! মুছে গেছে বাহাত্তরের সংবিধানের সেই ৪ মুলনীতি - সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। গণতন্ত্র এখন আর নেই বললেই চলে। সমাজতন্ত্র সেই কবেই মুছে গেছে। ধর্ম নিরপেক্ষতা! তার আগেই তো এখন উচ্চারিত ‘বিসমিল্লাহ রাহমানির রহিম’ ! আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুছে এরশাদ-জামায়াত এর সৃষ্ট বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে চলছে দেশ।

আজ মানুষের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় ভেদাভেদ, নৃশংসতা। রাজাকার-ধর্মীয় মৌলবাদীদের বাচাঁতে চলছে বেপরোয়া কর্মকাণ্ড। তাদের ঠেকাতে এগিয়ে আসছে না কোনো বাঙালি। এক কথায় মানুষ ভুলে গেছে কিভাবে আন্দোলন করতে হয় জোরালো কন্ঠে, কিভাবে রাজপথে অকুতোভয় এর মতো নেমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হয়। বাঙালি ভুলে গেছে নূর হোসেনকে। ভুলে গেছে সকল আন্দোলনের ইতিহাসকে। ২৯ বছরেও মুক্ত হয়নি “গণতন্ত্র মুক্তি পাক”, আজো নিপাত যায়নি “স্বৈরাচার নীপাত যাক”।

কিন্তু নূর হোসেন, তোমাদের দীক্ষায় দীক্ষিত আমরা আজো লড়ে চলেছি। পিছ’পা আমরা হবোনা। বাঙালি এবং বাংলাদেশ থেকে দূর করবো সকল অপশক্তির হাত। তোমায় লাল সালাম।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত