‘আমার কেন আর দুর্ভাবনা নেই’

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৬, ১৭:৪৪

আজকাল বাংলাদেশে প্রতিবছর খুব হইচই করে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড আয়োজন করা হয়। এই বছরের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের একটি অনুষ্ঠানে আমার আমান্ত্রণ ছিল। সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়া এবং অনুষ্ঠান শেষে আবার ফিরে আসা যথেষ্ট ঝক্কির ব্যাপার, যাব কি যাব না সেটা নিয়ে একটু দোটানার মাঝে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত চলেই গিয়েছিলাম। গিয়ে অবশ্যি খুব ভালো লেগেছে। বিশাল একটি আয়োজন, বাংলাদেশে এরকম বড় আয়োজন আমার খুব বেশী চোখে পড়েনি।

তবে আমি আজকে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড নিয়ে লিখতে বসিনি। সেখানে যাওয়ার কারণে আমার যে একটি বিশেষ উদ্যোগ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে সেটি নিয়ে লিখতে বসেছি।

একটি নির্দিষ্ট সেশানে আমাকে কথা কথা বলতে হয়েছে। দর্শকদের বেশীর ভাগই তরুণ কাজেই অনুষ্ঠান শেষে সেলফি তোলার আরেকটি সেশন শুরু হয়ে গেল। সেলফি সেশন যখন শেষ হয়েছে তখন লক্ষ করলাম তরুণদের ভীড়ে একজন বড় মানুষ আমার সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি যখন ছাড়া পেয়েছি ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব, তাদের একটা উদ্যাগ নিয়ে আমার সাথে কথা বলতে চান। বাংলা দেশের ছেলেমেয়েদের লেখা পড়া নিয়ে আমার উৎসাহ আছে তাই যখন কেউ শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে চান তখন সেটা আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনি।

সচিব মহোদয় তার একজন সহকর্মীকে নিয়ে হলঘরের একটা কোনায় বসে আমাকে বললেন, যশোর শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে তারা একটা প্রশ্ন ব্যাংক তৈরী করেছেন তারা সেটা নিয়ে একটু কথা বলতে চান। আমি একটু অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে তাকালাম। মাত্র কয়েকদিন আগে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনেকের সাথে এই দেশের শিক্ষাবিদদের একটা সভা হয়েছে। সেখানে কিভাবে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যে কয়েকটি প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে তার একটি হচ্ছে একটা বড় প্রশ্ন ব্যাংক বানানো, সেখানে অসংখ্য সৃজনশীল প্রশ্ন জমা থাকবে। শিক্ষকদের একটা বড় অংশ যেহেতু নিজেরা সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরী করতে পারে না কিংবা তৈরী করতে চান না তাই তাদের যখন দরকার হবে তারা সেই প্রশ্ন ব্যাংক থেকে প্রশ্ন নিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন।

এই মুহুর্তে শিক্ষকেরা অনেকেই গাইড বই থেকে প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা নেন। কাজেই ছেলেমেয়েরা শুধু পাঠ্য বই মুখস্থ করে না পাঠ্য বইয়ের সাথে আরো কয়েকটা গাইড বইও মুখস্থ করে। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে এই বছর যে জে.এস.সি পরীক্ষা হচ্ছে সেখানেও গাইড বই থেকে প্রশ্ন নেয়া হয়েছে। এই গাইড বইয়ের প্রকাশকরা নিশ্চয়ই পত্র পত্রিকা, টেলিভিশন, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিতে পারে। ‘আপনার ছেলে মেয়েদের আমাদের গাইড বই মুখস্থ করান, কারণ এই দেশের পাবলিক পরীক্ষায় আমাদের প্রকাশিতই গাইড বই থেকে প্রশ্ন নেয়া হয়’ যাই হোক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেই সভায় কীভাবে প্রশ্ন ব্যাংক বানানো যায় সেটা নিয়ে অল্প বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কেউ বলেনি যশোর শিক্ষা বোর্ড ইতিমধ্যে সেটা তৈরী করেছে।

যদি সত্যি সত্যি এতো বড় একটা কাজ হয়ে থাকতো উপস্থিত যারা ছিলেন তাদের কেউ না কেউ সেটা নিশ্চয়ই  উল্লেখ করতো। কাজেই খুব সঙ্গত কারণে আমি যশোর শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের দিকে খুবই সন্দেহের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ‘আপনারা সত্যি সত্যি এটা তৈরি করেছেন নাকি এটা তৈরী করার পরিকল্পনা করছেন?’ তারা বললেন শুধু যে তৈরী করেছেন তা নয় সেটা ব্যবহার করে তাদের এলাকার সব স্কুলে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে! কাজেই এই এলাকার গাইড বই এবং কোচিং সেন্টারের বারোটা বেজে যাচ্ছে। শুনে আমি রীতিমত হতবাক হয়ে গেলাম। যশোর শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা দুজন বললেন ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে যশোর শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে একটা স্টল দেয়া হয়েছে।

বিশ্বাস না করলে আমি নিজের চোখে গিয়ে দেখে আসতে পারি। নিজের চোখে দেখার জন্য সাথে সাথে তাদের সাথে রওনা দিলাম। যশোর শিক্ষা বোর্ডের স্টলে তারা আমাকে প্রথমে একটা ভিডিও দেখালেন- ভিডিওটা শর্ট ফিল্মের কায়দায় তৈরী করা। পরীক্ষার জন্য একটি মেয়ে পড়ছে। পাঠ্য বই না পড়ে মুখ কালো করে মোটা মোটা গাইড বই মুখস্থ করছে। শুধু তাই নয় স্কুল ছুটির পরে কোচিং সেন্টারে ভীড় করছে, সেখানে চালবাজ ধরণের একজন সবার হাতে মুখস্থ করার জন্য শিট ধরিয়ে দিচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা মুখ কালো করে নিরানন্দ এই জিনিসগুলো মুখস্থ করছে।

আমার সব চাইতে মজা লেগেছে যখন ভিডিওতে দেখানো হচ্ছে দরজার নিচ দিয়ে পেপারওয়ালা একটা ‘প্রথম আলো’ ঢুকিয়ে দিয়েছে। কঠিন চেহারার একজন মা পত্রিকাটি হাতে নিয়ে সেটি পড়ার কোনো চেষ্টা না করে সোজা পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ‘পড়াশোনা পৃষ্ঠা’ নামে যে গাইড বইয়ের পাতা ছাপা হয় সেটি কাঁচি দিয়ে কেটে তার মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর সেটি মুখস্থ করার জন্য একটুখানি দাবড়ানি দিয়ে এলো। হতভাগা মেয়েটি কোচিং সেন্টারের শীট, গাইড বই এবং প্রথম আলোর ‘পড়াশোনা পৃষ্ঠা’ মুখ কালো করে মুখস্থ করতে লাগল।  যারা এখনো জানেন না তাদের মনে করিয়ে দেয়া যায়, আমাদের দেশের সব কয়েকটি বড় বড় পত্রিকা দেশ, জাতি, সমাজ, শিক্ষা এসব নিয়ে বড় বড় আলোচনা করেন। কিন্তু তারা সবাই নিয়মিত ভাবে তাদের পত্রিকায় গাইড বই ছাপান।

যদিও এই দেশে গাইড বই বেআইনী। গাইড বই এবং পাঠ্য বইয়ের মাঝে পার্থক্য যারা জানেন না তাদের মনে করিয়ে দেয়া যায়, পাঠ্য বইয়ে একটা বিষয় সম্পর্কে লেখা হয়। গাইড বইয়ে শুধু প্রশ্ন এবং তার উত্তর লেখা হয়। ছেলেমেয়েরা গাইড বই থেকে কোনো বিষয় সম্পর্কে জানে না। তারা শুধুমাত্র কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর মুখস্থ করতে শিখে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেহেতু পরীক্ষা নির্ভর হয়ে গেছে তাই কোনো কিছু শেখার থেকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সবাই আগ্রহী। দেশের বড় বড় পত্রিকাগুলো অভিভাবকদের বোঝাতে পেরেছে যে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে তাদের পত্রিকায় ছাপানো গাইড বইটি ছেলে মেয়েদের মুখস্থ পড়ানো দরকার। 

দেশে যখন কোনো অন্যায় অবিচার হয় তখন মাঝে মাঝেই দেখি হাইকোর্ট নিজ থেকে এই অন্যায় অবিচারগুলোতে হস্তক্ষেপ করে বিষয়গুলোর সুরাহা করে দেয়। আমি স্বপ্ন দেখি এই দেশের অসংখ্য ছেলে মেয়ের লেখা পড়ার সর্বনাশ করা খবরের কাগজের এই গাইড বইগুলো হাই কোর্টের নির্দেশে কোনো একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। (স্বপ্ন যখন দেখেছি তখন পুরোটাই দেখে ফেলি, আমি স্বপ্নে দেখি এই দেশের ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অমানবিক এই নিয়ম বন্ধ করে হাইকোর্ট একদিন নির্দেশ দেবে সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নিতে হবে!)।  

যাই হোক যশোর শিক্ষা বোর্ডের সেই ভিডিওর বিষয়বস্তুতে ফিরে যাই। সেখানে দেখানো হয়েছে গাইড বইয়ের প্রকাশকেরা বড় বড় বান্ডিল করে স্কুলে স্কুলে যাচ্ছে এবং দুর্নীতিপরায়ন হেড মাস্টাররা সেই গাইড বই তাদের কাছ থেকে নিচ্ছে এবং ছাত্র ছাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। যে স্কুলগুলো ভালো সেখানে গাইড বইয়ের লোকজন ঢুকতেই পারছে না এবং স্কুল দারোয়ানের হুংকার শুনে প্রাণ নিয়ে পালাতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ছে। লেখাপড়ার এই ভূমিকাটি দেখিয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডের ভিডিওটিতে তারা প্রশ্ন ব্যাংকের মূল বিষয়টি ফিরে গেছে।

যার সৃজনশীল প্রশ্ন করার বিষয়টি জানান তারা শিক্ষকদের ট্রেনিং দিচ্ছেন। শিক্ষকরা তারপর সৃজনশীল প্রশ্ন করছেন এবং সেই প্রশ্নগুলো প্রশ্ন ব্যাংকে জমা হচ্ছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আধঘণ্টা আগে নেট থেকে পরীক্ষার জন্য এক সেট প্রশ্ন নামিয়ে সেটা ছাপিয়ে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। ভিডিওতে দেখানো হয়েছে পরীক্ষার শেষে ছেলেমেয়েরা নিজেরা নিজেরা কথা বলছে। যারা শুধু নিজেরা নিজেরাই পাঠ্য বইটা পুরো পড়ে এসেছে তারা বলছে তাদের পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। যারা গাইড বই, কোচিং সেন্টারের শিট, এবং খবরের কাগজের শিক্ষাপাতা মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়েছে তারা হতাশ ভাবে মাথা নেড়ে বলছে তাদের পরীক্ষা একেবারেই ভালো হয়নি। কারণ মুখস্থ করে আসা অসংখ্য প্রশ্ন এবং উত্তর থেকে একটি প্রশ্নও ‘কমন’ পড়েনি!  ভিডিওটি কাল্পনিক ভিডিও এবং অবশ্যই যশোর শিক্ষা বোর্ড এটি তৈরী করেছে।

তাদের নিজেদের উদ্যাগটির প্রচারণা করার জন্য কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হবে লেখাপড়ার একেবারে মূল সমস্যাগুলো তারা কিন্তু দেখতে পেরেছেন। এটি শুধুমাত্র একটা প্রচারণা মূলক ভিডিও হতে পারতো যদি এর পিছনের কাজগুলো করে না রাখতেন। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা আমাকে জানিয়েছেন কয়েক বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সব শিক্ষা বোর্ডের কাছে প্রশ্ন ব্যাংক বানানোর জন্য নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিলো এবং সেই নির্দেশনা পেয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ড তাদের প্রশ্ন ব্যাংক তৈরী করার উদ্যাগটি নিয়েছিল।

প্রশ্ন করার জন্য একটা চমৎকার পোর্টাল তৈরী করা হয়েছে। কর্মকর্তারা আমাকে সেটি দেখিয়েছেন এবং দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে অভিভূত করেছে সেটি হচ্ছে প্রশ্নের সংখ্যা, তার আমাকে জানিয়েছেন তাদের প্রশ্ন ব্যাংকে ইতিমধ্যে এক লাখের মতো প্রশ্ন জমা হয়ে গেছে! শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে যেহেতু সব শিক্ষা বোর্ডকেই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিলো কাজেই হয়তো অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডও একই ভাবে প্রশ্ন ব্যাংক তৈরী করে ফেলেছেন কিংবা করতে যাচ্ছেন। আমি যেহেতু শুধুমাত্র যশোর শিক্ষা বোর্ডের উদ্যাগটি দেখেছি তাই শুধু তাদের কথাটিই বলছি! অন্যদের কথা জানলে সেটিও সমান আগ্রহ এবং উৎসাহ নিয়ে বলতাম। আমাদের দেশে যখন প্রথম সৃজনশীল প্রশ্ন চালু করা হয়েছিল তখন আমরা সবাই এটা নিয়ে খুবই আগ্রহী হয়েছিলাম।

এটা বাংলাদেশের আবিষ্কার নয় সারা পৃথিবীতেই এভাবে পরীক্ষা নেয়া হয়। আমরা একটু দেরি করে শুরু করেছি। যখন এই পরীক্ষা পদ্ধতিটি চালু করা হয় তখন আমরা অনুমান করেছিলাম প্রথম প্রথম এভাবে প্রশ্ন করতে শিক্ষকদের একটু অসুবিধে হবে কিন্তু ধীরে ধীরে সবাই ব্যপারটা ধরে ফেলবে। শিক্ষকদের সেজন্য ট্রেনিং দেয়া হবে এবং প্রথম প্রথম কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশ্ন তৈরী করে স্কুলগুলোতে পাঠানো হবে। আমরা আবিষ্কার করলাম পরীক্ষার মান বাড়ানোর থেকে পরীক্ষায় পাশের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে একটা ঝোঁক তৈরি হল এবং যেনতেন পরীক্ষা হলে কিংবা প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেলেও সেটা নিয়ে কারো তেমন মাথা ব্যাথা হতো না।

এখানে ‘কারো’ বলতে আমি যে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বোঝাচ্ছি তা নয়। আমাদের দেশের বড় বড় শিক্ষাবিদদের কথাও বলছি। প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আমি কাউকে তেমন সেচ্চার হতে দেখিনি এবং আমি চেষ্টা করেও বড় বড় শিক্ষাবিদদের এটা নিয়ে একটা সেমিনারের আয়োজন করাতেও পারিনি। তখন যা হবার কথা তাই হতে লাগল গাইড বই থেকে প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা নেয়া শুরু হল এবং সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতির যেটুকু ভালো ফল নিয়ে আসার কথা ছিল ঠিক ততোটুকু খারাপ ফল আনতে শুরু করলো।

দুর্ভাগা ছাত্রদের পুরো বইয়ের সাথে সাথে কুৎসিত গাইড বই মুখস্থ করা শুরু করতে হল। অন্য সবার মত আমিও বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি এবং আমার মনে হয়েছে এই সমস্যার সবচেয়ে সহজ আর কষ্টকর সমাধান হচ্ছে একটা প্রশ্ন ব্যাংক। সেখানে একশ দুশ প্রশ্ন থাকবে না আক্ষরিক অর্থে লক্ষ লক্ষ প্রশ্ন থাকবে। শিক্ষকেরা তাদের প্রয়োজনে সেখান থেকে প্রশ্ন নামিয়ে পরীক্ষা নিতে পারবেন, ছত্রছাত্রীরা সেখান থেকে প্রশ্ন নামিয়ে নিজেদের যাচাই করতে পারবে। (যেহেতু একই সাথে প্রশ্ন এবং উত্তর নামিয়ে সেটা মুখস্থ করার সুযোগ থাকবে না তাই সেটা কখনোই গাইড বই হয়ে যাবে না!) ছাত্রছাত্রীরা যখন আবিষ্কার করবে তাদের পরীক্ষার প্রশ্ন আর কোনো গাইড বই থেকে আসছে না কিংবা কোনো কোচিং সেন্টারের মডেল টেস্ট থেকে আসছে না তখন রাতারাতি এই বাণিজ্যগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু এই উদ্যোগটি সহজ নয়, ব্যক্তিগত ভাবে কারো পক্ষে সম্ভব নয়, এটি করা সম্ভব শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে। তাই যখন আমি আবিষ্কার করেছি যশোর শিক্ষা বোর্ড আমি যে বিষয়টি নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম হুবহু সেই বিষয়টি করে রেখেছে তখন আমার আর আনন্দের সীমা ছিল না। (আমার ছাত্র আর শিক্ষকেরা মিলে এই ধরনের একটা উদ্যাগ বেশ আগেই নিয়েছিল, যশোর শিক্ষা বোর্ডের  উদাহারণটি দেখে তাদের উৎসাহ শতগুণে বেড়ে গেছে।) কাজেই আমি আনুমান করছি যশোর শিক্ষা বোর্ডের উদাহারণটি দেখে এরকম অনেকগুলো একই ধরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। সব শিক্ষা বোর্ড যদি ইতিমধ্যে এটি করে ফেলে না থাকে নিশ্চয়ই তারাও এর কাজ শুরু করবে। (এবং হ্যাকাররা এটা হ্যাক করে ফেসবুকে দেয়ার চেষ্টা করবে কিন্তু সেটা অন্য ব্যাপার! প্রযুক্তির সমস্যা আমাকে কখনোই দুর্ভাবনায় ফেলে না)।

কাজেই বলা যেতে পারে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা সঠিক ভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন করা তার একটা চমৎকার সমাধান বের হয়ে গেছে। সৃজনশীল পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর এটিকে নানা ধরণের প্রশ্নের সম্মখীন হতে হয়েছে। যারা এটা সম্পর্কে ভাসা ভাসা ভাবে জানেন তাদের সবচেয়ে প্রিয় প্রশ্ন হচ্ছে এরকম: আমরা সৃজনশীল পরীক্ষা নিচ্ছি কিন্তু ছত্রছাত্রীদেরকে আমরা কি সৃজনশীল ভাবে পড়িয়েছি? এই প্রশ্ন শুনে আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারি না। কারণ প্রশ্নের বেলায় ‘সৃজনশীল’ শব্দটি একটি নাম ছাড়া আর কিছু নয়। এর প্রকৃত নাম ‘কাঠামোবদ্ধ’ শব্দটি একটু খটমটে বলে এই নামটি দেয়া হয়েছিল। 

যাই হোক যশোর শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন ব্যাংক, সেই প্রশ্ন ব্যাংকে প্রশ্ন জমা দেয়ার পদ্ধতি এবং সেই প্রশ্ন ব্যবহার করে পরীক্ষা নেয়ার প্রক্রিয়াটি দেখে আমর সমস্ত দুর্ভাবনা একেবারে কেটে গিয়েছে। তারা একটি চমৎকার উদাহারণ তৈরী করেছেন আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি এখন সেই উদাহারণটি অন্য সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে।  

সেজন্য বলছিলাম লেখাপড়া নিয়ে এখন আমার আর কোনো দুর্ভাবনা নেই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, শাবিপ্রবি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত