বিশ্বজিৎ দাস হত্যাঃ নষ্ট ছাত্র রাজনীতির স্বরূপ

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৩:১০

কথা রাখতে পারেননি বিশ্বজিৎ দাস। তিনি তার দর্জির দোকানে জামা বানাতে আসা গ্রাহকদেরকে নির্ভরতা দিয়ে বলেছিলো, ‘অমুক তারিখে অবশ্যই আপনার জামাটা পেয়ে যাবেন’। বিশ্বজিৎ সেদিন সকালে বাসা থেকে বের হবার সময় শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে মা’কে বলেছিলো, ‘মা দরোজাটা লাগিয়ে দাও, রাতে ফিরবো’। কিন্তু বিশ্বজিৎ কথা রাখতে পারেননি। মাকে ফাঁকি দিলেন, ফাঁকি দিলেন তার গ্রাহকদের। ছাত্রলীগের নৃশংসতার কবলে পড়ে অজানার দেশে পাড়ি দেয়া বিশ্বজিৎ আর কাকে কি কি কথা দিয়েছিলেন সেটা আমি জানিনা। তবে আমি জানি একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরী হিসেবে আমরা আমাদের শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদেরকে কথা দিয়েছিলাম অন্য কিছুর। এমন বাংলাদেশ নির্মানের কথা দেইনি আমরা তাদেরকে। 

বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখ রবিবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে। রাজনৈতিক সংগঠন ছাত্রলীগের কমীর্রা বিশ্বজিৎ দাসকে বিনা কারণে প্রকাশ্য-দিবালোকে শত শত মানুষ ও আইনরক্ষা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করে। 

পঁচিশ বৎসর বর্ষীয় যুবক বিশ্বজিৎ-এর বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর দাস পাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম অনন্ত দাস। মায়ের নাম মা কল্পনা রানী ঘোষ। সে ছিল শান্ত প্রকৃতির মানুষ। হাঙ্গামা-হুজ্জত একেবারেই পছন্দ করতো না। একটু ভীরু স্বভাবী ছিল। মিছিলে কখনো যায় না। রাজনীতি করতো না। ২০০৬ সালে ঢাকার শাঁখারী বাজারে দর্জির কাজ শুরু করে বিশ্বজিৎ। দোকানের নাম ছিল নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্স। বড় ভাইয়ের দোকান।

সেদিন ১৮ দলীয় জোট সরকারবিরোধী অবরোধ কর্মসূচির দেয়। এই কমর্সূচীর সমর্থনে সকাল ৯টার দিকে পুরোনো ঢাকা জজ কোর্ট থেকে সরকারবিরোধী আইনজীবীরা একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আইনজীবীদের ওপর হামলা চালায়। আক্রান্ত আইনজীবীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। পেশায় দর্জ্জি বিশ্বজিৎ দাস সেদিন অন্যসব দিনের মতোই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হেঁটে পার হওয়ার সময় আন্দোলবিরোধীরা তাকে আঘাত হানা শুরু করে। নির্বিচার কিল-ঘুষি-লাথি ছাড়াও এই শীর্ণকায় যুবককে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। তদুপরি চাপাতির কোপে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলা হয়। বিশ্বজিৎ বারবার মানুষ রূপী নষ্ট রাজনৈতিক পশুদের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলেন, বারবার আকুতি জানিয়েছিলেন বাঁচার অধিকারটুকো পাবার জন্য। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ পশুদের চোখে তখন চেপে বসেছিলো নষ্ট রাজনীতির ঘৃণ্য অন্ধকার।

এ সময় ধাওয়া খেয়ে পথচারী বিশ্বজিৎ দৌড়ে প্রথমে নিকটস্থ ভবনের দোতলায় অবস্থিত একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় গ্রহণ করে। ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঐখানে ক্লিনিকে বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচার কিল-ঘুষি-লাথি চালানো হয়। তার গায়ে লোহ শলকা দিয়ে সজোরে আঘাত করা হয়। আহত বিশ্বজিৎ প্রাণ বাঁচাতে পাশের আরেকটি ভবনে ঢুকে পড়ে। কিন্তু তখন পেছন ধাওয়া করে সেখানেও বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের রক্তখেকো পিশাচেরা কর্মীরা। ৮-১২ জনের একটি মৃত্যুকামী দল তাকে আঘাত করতে থাকে, পেটানো হয় সবল লোহার রড এবং চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হতে থাকে। তার কাপড় ছিঁড়ে যায়, সারা শরীরে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। সে আবার পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আঘাত অব্যাহত থাকে। সে এক পর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পথচারীদের কয়েকজন বিশ্বজিৎকে পাশের ন্যাশনাল হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা বাধা দেয়। প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় উঠে দৌড় দেয়; কিন্তু শাঁখারীবাজারের একটি গলিতে গিয়ে ঢলে পড়ে যায়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় এক রিকশাওয়ালা তাকে নিকটস্থ মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। অচিরেই মৃত্যু এসে তাকে সকল আক্রমণের ঊর্দ্ধে নিয়ে যায়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক ঘাতকরা জানায়, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন রাতে তারা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারির সঙ্গে গোপন বৈঠক করে। ঐ গোপন বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে অবরোধের পক্ষে কেউ মিছিল বের করলে তাদের ওপর হামলা চালাতে হবে। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা সহযোগিতা থাকবে। 

এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের চলচ্চিত্র ঘটনার অব্যবহিত পরে টেলিভিশনে প্রচারের পর দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। পুরো জাতি প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রয়া পাওয়া যায় নি।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে মাহফুজুর রহমান নাহিদ, ইমদাদুল হক, নূরে আলম লিমন, রফিকুল ইসলাম শাকিল ও ওবায়দুল কাদের তাহসিন - এই পাঁচ জনের বিরুদ্ধে করেছে। বর্তমান তিন ছাত্র যথা মনোবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ওবায়দুল কাদের, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মীর মো. নূরে আলম লিমন এবং ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. রফিকুল ইসলাম শাকিল- এই তিনজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক দুই ছাত্রের সনদপত্র বাতিল করা হয়েছে। এরা হলো, দর্শন বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ইমদাদুল হক ও বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মাহফুজুর রহমান।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইউনুছ বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে। তার নির্দেশে পথচারী বিশ্বজিতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রফিকুল ইসলাম শাকিল, মাহফুজুর রহমান নাহিদ, সাইফুল ইসলাম, কিবরিয়া, কামরুল ইসলাম, শাওন, মীর মো. নূরে আলম লিমন, ইমদাদুল হক, সুমন, ওবায়দুল কাদের ও রাজন।

যে রড দিয়ে পিটিয়েছে ও পরে বিশ্বজিতের শরীরে রড ঢুকিয়ে দেয় তার নাম মাহফুজুর রহমান নাহিদ। নাহিদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র। পিতার নাম মাওলানা মহীউদ্দীন। তার বাড়ি হাতিয়ার চরকৈলাশ এলাকায়। সে বিশ্বজিতের শরীরে রড ঢুকিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।

যে চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিৎকে কুপিয়েছে তার নাম রফিকুল ইসলাম শাকিল, পিতার নাম আনছার আলী, বাড়ি পটুয়াখালী জেলা সদরে। তার পরনে ছিল সাদা শার্ট। সে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র। তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা আছে।

বিশ্বজিৎ দাশ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীদের গ্রেফতারের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করা হয়। একই সঙ্গে নিহত বিশ্বজিৎ দাসের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন করা হয়। এছাড়া ঘটনার সময় পুলিশের নিস্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তার রুল জারিরও আবেদন করা হয়। ১১ই ডিসেম্বর জনস্বার্থে রিট পিটিশন দাখিল করেন হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ড. মো. ইউনূস আলী আকন্দ। হাইকোর্টের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি ফরিদ আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ঘাতকদের আটকের জন্য সরকারকে আদেশ প্রদান করে।

বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জন কর্মীর মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৩ বুধবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক এ বি এম নিজামুল হক এ রায় ঘোষণা করেন।

হামলা, হত্যা, বহিষ্কার, বিচার ও বিচারের রায়ের পথ পাড়ি দেয়ার পরেও কেটে গেছে তিন বছর কিন্তু কার্যকর হয়নি ফাঁসির আদেশ পাওয়া কারোই ফাঁসি। তাই এই বিচারের রায় কি কেবলই কাগুজে রায় হয়ে থাকবে বাস্তবায়ন করা হবে সেটা নিয়ে সাধারণ মানুষের রয়েছে আশঙ্কা। আইনের ফাঁক গলে ক্ষমতার হাত ধরে মুক্তি পাবেনা তো আবার ? সেইসব আদিম পশুরা মুক্তি পেয়ে আবার দূষিত করবে না তো মানুষের সমাজ ?

আমরা এই আশাটুকো ধরে রাখতে চাই যে আমাদের রাষ্ট্র খুনিদের পাশে দাঁড়াবেনা। যৌক্তিক ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রই প্রমাণ দেবে যে এই রাষ্ট্র কার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত