প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৭, ১৭:১৫

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কালে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় জিন্নাহর নেতৃত্ব মানলেও অনেকের ভেতরে ভিন্ন মত ছিল । কিন্তু ১৯৪০ সালের মুসলিম লীগ কাউন্সিলে সুচতুর জিন্নাহ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হককে দিয়ে লাহোর প্রস্তাব পাস করেন, যেখানে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ ছিল। এটিই ছিল পাকিস্তান প্রস্তাব। ১৯৪৬ সালে দিল্লি পার্লামেন্টারি পার্টিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাবিত এক পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অনেকে এর বিরোধিতা করেন। আবুল হাশিম প্রতিবাদ করলে তাকে চ্যাংদোলা করে প্যান্ডেলের বাইরে ঠেলে দেয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে প্রথমেই শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দলের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি গণপরিষদে বিশেষ আইন পাস করা হয়, যাদের বাসস্থান পাকিস্তানে থাকবে না, তাদের সদস্যপদ বাতিল হবে। এর মূল টার্গেট ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যেন গণপরিষদের সদস্য না থাকতে পারেন। এমনকি পূর্ব বাংলায় তিনি আগমন করলে ২৪ ঘণ্টা নোটিশে তাকে কলকাতায় ফেরত পাঠানো হয়। বিপরীতে জিন্নাহ গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ব বাংলা থেকে নির্বাচিত যোগেশ মণ্ডলকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করে দেখাতে চাইলেন, তার কাছে সব ধর্মই সমান। এটাও ছিল একটা 'ভাঁওতাবাজি'। কেননা জিন্নাহর মৃত্যুর পর যোগেশ মণ্ডলকে নানাভাবে হেনস্তা করে পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত করে ভারত পাঠিয়ে দেয়। এভাবে জন্মেই আজন্ম পাপ নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতি শুরু হয়।

২. এসব ঘটনাবলির মধ্যে পূর্ববঙ্গের উঠতি তরুণগোষ্ঠী যারা প্রগতিশীল চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন, তারা পাকিস্তান যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা মেনে নিতে পারেননি। কলকাতা বসেই তারা সিদ্ধান্ত নেন, পূর্ববঙ্গে গিয়ে রাজনীতি শুরু করতে হবে। প্রথমে যুবলীগ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ও নেতৃত্বে ছাত্রলীগ গঠিত হয়। এ সময় ভাষার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি জানালে তা পূর্ববঙ্গে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। 

৩. ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন কিছু মুসলিম লীগ জনপ্রতিনিধি ও কর্মী নেতৃত্বের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে বিক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকায় দু'দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে 'জনগণের মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠা করেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও আন্দোলনের কারণে রাজবন্দি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে আটক থাকলেও তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয়। 

৪. পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিগ লীগের মেনিফেস্টোর অন্যতম দিকগুলো ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়াবলি ও মুদ্রাব্যবস্থা ন্যস্তকরণ; বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান; বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদকরণ এবং ভূমিহীনদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ; আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী সমবায় কৃষি ব্যবস্থা ও শিল্প শ্রমিকদের সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকরণ; অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন। এসবই ছিল জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তবে মূলত ভাষার সংগ্রাম সর্বস্তরের বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান দল। 

৫. ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করে শেখ মুজিবুর রহমান সারাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের মৌলিক বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরেন। এরই ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ঘোষণা করলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষায় তা দমনের জন্য হুমকি প্রদান করেন। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির মূল টার্গেট হয়ে দাঁড়ান শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব সম্পর্কে আইয়ুব খানের মন্তব্য হলো, 'ওই ব্যক্তি এমন কিছু করবে না যা পাকিস্তানকে শক্তিশালী করবে বরং পাকিস্তান ভেঙে ভারতের সঙ্গে কনফেডারেশন করবে।' আইয়ুব খান 'শেখ মুজিব বনাম রাষ্ট্র' শীর্ষক একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করেন, যাতে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং দেশের নিরাপত্তা ও সংহতি ধ্বংসকারী ব্যক্তি হিসেবে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করা হয় এবং তাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দেশবাসী প্রত্যক্ষ করল নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্য প্রতীক শেখ মুজিবকে যদি ফাঁসি দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের ওপর শোষণ, শাসন, বৈষম্য, নির্যাতন ও পরাধীনতা চিরতরে গেড়ে বসবে। এই মামলায় সরকারের প্রধান কেঁৗসুলি মঞ্জুর কাদির ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাদীপক্ষের যুক্তি প্রদর্শন শুরু করেছিলেন; তবে আদালতের প্রসিডিংস ১৩ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয় ও পরে এই মুলতবি আদেশ ১০ মার্চ, ১৯৬৯ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ সময় আন্দোলন এমন পর্যায়ে চলে যায় আইয়ুব খান বাধ্য হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে দেশ থেকে জরুরি অবস্থা ও পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন প্রত্যাহার করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেওয়া হয়। 

৬. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিসনদ ৬ দফা নিয়ে বাংলার শহর, গ্রামগঞ্জে চারণের বেশে ঘুরে বেড়ান। '৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ শত ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত উপেক্ষা করে ৬ দফার প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানায়। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। 

৭. প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান, সামরিক জান্তা ও আমলাচক্র উপলব্ধি করে, ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম পাকিস্তানের খবরদারি থাকবে না। শোষণ ও শাসন করা যাবে না। বৈষম্য থাকবে না। ৬ দফার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলার স্বাধীনতা। সে কারণে ইয়াহিয়া খান লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক জারি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাত-পা বেঁধে ফেললেন। সমস্ত ক্ষমতা তিনি নিজের হাতে রাখলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, জনগণের ম্যান্ডেট পেলে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ককে টুকরো টুকরো করে ফেলব। নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে প্রকৃত অর্থেই তিনি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ককে অকেজো করে ফেলেন। ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু হলে ১ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জনযুদ্ধের ঘোষণা দেন। ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং ২৩ মার্চ পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকার গণঅনুমোদন দেন। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার কারণ হিসেবে ইয়াহিয়া খান বলেন, শেখ মুজিব যখন দুই অ্যাসেমবি্ল, দুই পতাকা এবং সামরিক আইন প্রত্যাহারের কথা বলেন, তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি অখণ্ড পাকিস্তান চান না। বাধ্য হয়ে তিনি ২৫ মার্চ রাতে সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতি মোকাবেলার নির্দেশ দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

৮. রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা সংগ্রামে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর আত্মত্যাগ কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? নেতৃত্বের প্রতি জনগণের অখণ্ড আস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জনগণের আত্মত্যাগ ও ত্যাগী আদর্শবাদী কর্মী বাহিনীর অকুতোভয় সাহস ও অকাতরে জীবনদান। সংগ্রামের এই ঐতিহ্যের পথ-পরিক্রমায় ইদানীং আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণে কী কী সবলতা ও দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। এ কথা সবাই বলেন যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। শিক্ষার হার বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে, আর্থিক প্রবৃদ্ধি উপমহাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ, রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে। রেমিট্যান্স সামনের দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি সোশ্যাল নেটওয়ার্কের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। খাদ্যে উদ্বৃত্ত। বিদ্যুৎপ্রবাহ বেড়েছে। মানুষের জীবনমান উন্নীত হচ্ছে। জঙ্গিবাদ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এর পরও আওয়ামী লীগ নিয়ে সমালোচনার কমতি নেই। সমালোচনার বড় তীরটি হলো দুর্নীতি। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেন, দুর্নীতি সব দেশেই আছে। কথাটি এই অর্থে যে, বিশ্বায়নের পুঁজিবাদী অর্থনীতি চালু থাকবে আর দুর্নীতি থাকবে না তা হতে পারে না। নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র ঢুকে পড়েছে। আওয়ামী লীগের হাজারো সদস্যকে দুর্নীতির ব্যাধি খেয়ে ফেলছে। যেমন ধরেছে মাদক। কেন এমনটি হয়েছে? পার্টির ত্যাগী নেতাকর্মীরা আজ আর তেমন সোচ্চার নয়। ওয়ার্ড ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা সর্বত্রই দখলের প্রতিযোগিতা। কারণ দলের পদে থাকলে অর্থ উপার্জনের উপায় খুলে যায়। প্রশাসন কিছু বলে না, চাকরির স্বার্থে অথবা ভাগাভাগিতে লিপ্ত। পার্টির নেতাকর্মীরা যেখানে জনগণের অর্থে গৃহীত প্রকল্প যাতে সুষ্ঠুভাবে সুসম্পন্ন হয়, তার 'ওয়াচ ডগ' হিসেবে পাহারা দেবে_ প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনবে, সে কাজটি হচ্ছে না। বরং কিছু কিছু কর্মী ঠিকাদারি বা ভাড়াটে তাঁবেদার হয়ে সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন আর্থিক সেক্টরে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা পাল্লা দিয়ে সরকারের শুভ ও গণহিতকারী কাজগুলোকে অশুভ স্বার্থে ভণ্ডুল করে দিচ্ছে।

এমতাবস্থায় পার্টিতে শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে কর্মীদের ও জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'আত্মত্যাগ, আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।' বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত ঘুরেফিরে নানাভাবে নানা মাত্রিকতায় এ কথাগুলোই বলে চলেছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? কারণ, বিশ্বায়নের এই যুগে প্রচলিত আর্থ-সামাজিক প্রশাসন বহাল রেখে এই অশুভ রাহুগ্রাস থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য অপরিহার্য হলো- দক্ষ, সৎ, নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের নিয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নবজাগৃতি সৃষ্টি করা। সেই অপেক্ষায় বাংলার মানুষ তাদের ভরসাস্থল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছে। 

লেখক: সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত