১৫ আগস্ট: ৪২ বছর আগে ও পরে

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৭, ১৬:৫৮

রিপ ভ্যান উইঙ্কল ২০ বছর ঘুমিয়ে থাকার পর জেগে উঠে দেখেন, তিনি তাঁর পরিপার্শ্ব কিছুই চিনতে পারছেন না। তিনি কোথায় এলেন? আশপাশের লোকজনকেও চেনেন না। বেশির ভাগই নতুন মুখ। একটু খোঁজখবর নিয়েই জানতে পারলেন, কয়েক বছর হয় তাঁর দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আমেরিকা স্বাধীন। নতুন পতাকা উড়ছে আকাশে। মানুষজন বদলে গেছে।

আমি বাংলাদেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে আসি ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে। পরের মাসের ১৫ তারিখে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। তারপর দীর্ঘ ১৮ বছর দেশে আসিনি, অথবা আসতে পারিনি।

১৯৯২ সালে দেশে বেড়াতে আশার সুযোগ পাই।

আমার তখন রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো অবস্থা। ১৮ বছর আগে আমি যখন দেশ ছেড়ে যাই তখন বঙ্গবন্ধু দেশটির রাষ্ট্রপতি এবং সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশটির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিল একটি সুপারপাওয়ারের গোয়েন্দাচক্রের নীলনকশা।

তখন হাওয়ায় এই ষড়যন্ত্রের গন্ধ ভাসছিল। কিন্তু কারো বিশ্বাস হয়নি এই ষড়যন্ত্র কোনো দিন সফল হবে। বঙ্গবন্ধু তখন জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় মহীরুহ, তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি বাড়ছে। জুলিও কুরির নামাঙ্কিত বিশ্বশান্তি পুরস্কার পাওয়ায় বিশ্ববন্ধু খেতাব পেয়েছেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের তিন নেতা—নেহরু-নাসের-কাস্ত্রোর মধ্যে তখন নেহরু ও নাসের বেঁচে নেই। কিন্তু নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেছেন মুজিব ও ইন্দিরা। সঙ্গে রয়েছেন কাস্ত্রো। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ৭৩ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে যে সংবর্ধনা জানানো হয় তা ছিল অভূতপূর্ব। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

এটা ছিল ১৯৭৩ সালের ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে আমি লন্ডনে। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য এসেছি। খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে শুনলাম, বঙ্গবন্ধু নেই। তাঁকে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে খবরটা আমার বিশ্বাস হয়নি। এভাবে বিনা মেঘে আকাশ থেকে বজ্র নেমে আসতে পারে, তা কি বিশ্বাস করার কথা? কিন্তু রূঢ় বাস্তবতাকে কতক্ষণ অস্বীকার করে থাকা যায়? তাই একসময় শোক ও বিষাদের মধ্যে স্বীকার করে নিতে হলো বঙ্গবন্ধু নেই। নেই বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা, কামাল, জামাল ও ১০ বছরের বালক রাসেল। নেই সদ্যবিবাহিত বধূ সুলতানা ও রোজি। নেই আরো অনেকে।

বিদেশে বসে ভেবেছি, বাংলার মানুষ নিশ্চয়ই এখন কাঁদছে। এই কান্না যখন থামবে, তখন সেই শোক থেকে ক্রোধের শক্তিশেল তৈরি হবে। সেই শক্তিশেলে ঘাতকদের একদিন নিপাত ঘটবেই। সেই ১৯৭৫ সালের লন্ডনের রাজপথে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা মিছিল বের করে স্লোগান দিয়েছিল—‘ঘাতক, খুনি যেখানেই থাকো, শাস্তি তোমায় পেতেই হবে। ’ এই স্লোগান সত্য হোক সেই আশায় ১৮ বছর ঘাতক-নিপাতের আন্দোলনে যুক্ত রয়েছি। বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে কবিতা পড়েছি।

‘মুজিব মানেই মুক্তি এবং মুজিব মানেই বাংলাদেশ
এই মাটিতেই হবে একদিন সকল বর্বরতার শেষ। ’

১৮ বছর পর দেশে ফিরে দেখেছি, যা ভেবেছি তা তো নয়। ঘাতকশক্তি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে তাদের নেত্রীর ছবি ঝুলছে। বঙ্গবন্ধুর নামোচ্চারণ অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ। শুনলাম, কয়েক বছর আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখার জন্য কবি নির্মলেন্দু গুণকে থানায় ডেকে নিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বেশ কয়েক বছর বঙ্গবন্ধুর নাম, জয় বাংলা স্লোগানটি পর্যন্ত কেউ উচ্চারণ করতে পারেনি। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর নাম শোনা যায়নি। সংবাদপত্রে তাঁর নাম, ছবি ছাপা হয়নি, মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু নামে কেউ এ দেশে জন্ম নেননি। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেননি।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে আমি যখন দেশ থেকে লন্ডনে পাড়ি দিই, তখন দেশ বঙ্গবন্ধুর জয়গানে মুখরিত। এক বৃষ্টিমুখর সকালে দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর নতুন শাসন পদ্ধতিকে সমর্থন জানাতে অসংখ্য শিল্পী-সাহিতিক্যের সঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান গণভবনের সামনে উপস্থিত। কামরুল হাসান ঢোলক বাজিয়ে নাচছেন। সেই বাংলাদেশে ১৮ বছর পর ফিরে এসে দেখেছি সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবস সরকারি মহলে উপেক্ষিত। সরকারের ছুটির তালিকায়ও দিনটি নেই। সম্ভবত তখনই অথবা তার কিছু পরে থেকেই খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টকে তাঁর জন্মদিবস বানিয়ে বিশাল কেক কেটে উৎসব পালন শুরু করেন। এই অশ্লীল উৎসব করার সময় ১০ বছরের শিশু রাসেল ও সদ্য বিবাহিত বধূ সুলতানা ও রোজির রক্তাক্ত মৃতদেহও কি তাঁর চোখে একবার ভেসে ওঠেনি।

১৯৯২ সালে বুকে শোক, ক্ষোভ ও ক্রোধ নিয়ে বিলাতে ফিরে এসেছিলাম। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে যখন দেশ ছেড়ে আসি, তখন বাংলাদেশ নতুন এক উদিত সূর্যের দেশ, বঙ্গবন্ধুর নতুন দেশ গড়ার সংগ্রাম তখন শুরু হয়েছে। পুরনো গণবিরোধী ও ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো ভেঙে তিনি নতুন এক সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চলেছেন। যে ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিকেন্দ্রিত হবে এবং তা যাবে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের হাতে। বঙ্গবন্ধু এই নতুন ব্যবস্থার নাম দিয়েছিলেন শোষিতের গণতন্ত্র। দেশে আমলাতন্ত্রের আধিপত্য শেষ হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত জনগণতন্ত্র।

দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল। তারা একে একদলীয় ব্যবস্থা, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচার চালিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ প্রশস্ত করেছিল। কিন্তু এখন দেশ-বিদেশের একাধিক অর্থনীতিবিদ বলছেন, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব সফল হলে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত মডেল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত। বর্তমানে ধনতান্ত্রিক উন্নতি সত্ত্বেও দেশটি যেভাবে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিকবলিত এবং চরিত্রভ্রষ্ট নব্যধনীদের অভ্যুত্থানে বিশাল সামাজিক অবক্ষয় চলছে, সেই সঙ্গে রাজনীতি সম্পূর্ণ কলুষিত, এই অবস্থার উদ্ভব হতো না।

রিপ ভ্যান উইঙ্কলকে মুক্ত স্বদেশ দেখার জন্য ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমাকে ঘাতকদের কবলমুক্ত স্বদেশ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ২১ বছর। ধীরে ধীরে বাংলাদেশে জনসিংহের ঘুম ভাঙে। ক্ষমতা থেকে ঘাতকশক্তি অপসারিত হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হয়। আজ ৪২ বছর পর দেখছি, বঙ্গবন্ধু শুধু স্বদেশে ফিরে আসেননি, জাতীয় জীবনে আবার স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, যিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণের কয়েক দিন পর সমাধি থেকে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সমাধি থেকে উঠে এসেছেন ২১ বছর পর। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন; কিন্তু নেতৃত্ব দিয়েছেন পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ ছিল ষড়যন্ত্রকবলিত। ২০১৭ সালে, ৪২ বছর পর দেখছি বাংলাদেশ আবার ষড়যন্ত্রকবিলত। পুরনো ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে নতুন ষড়যন্ত্রকারীরা যুক্ত হয়েছে এবং পুরনো লক্ষ্য হাসিলের জন্য ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে। ৪২ বছর আগের ও পরের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য এই যে, ১৯৭৫ সালে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দেশের মানুষ ছিল অসচেতন ও অসতর্ক। ২০১৭ সালে এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য সম্পর্কে মানুষ সতর্ক ও সচেতন। তারা জানে, এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম ব্যর্থ করা।

এখন দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৫ সালের জীবিত মুজিব যতটা শক্তিশালী ছিলেন, ২০১৭ সালের মৃত মুজিব তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। টুঙ্গিপাড়ায় যাঁর রক্তাক্ত মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়ে ঘাতকরা ভেবেছিল, শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশকেও তারা চিরদিনের জন্য সমাহিত করেছে, তিনি যিশুখ্রিস্টের মতো সমাধি থেকে উঠে এসেছেন। ঘাতক ড্রাকুলারা এখন পরাজিত এবং অনেকেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। ড্রাকুলারা যেমন ক্রস চিহ্ন দেখলে ভয় পায়, বাংলাদেশে ঘাতকচক্রও বঙ্গবন্ধুর নাম শুনলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়।

৪২ বছর পরও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটটি মেঘমুক্ত নয়। শেখ হাসিনার পরিচালনায় দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশ এখনো দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপশাসন মুক্ত নয়। সর্বোপরি একাত্তর ও পঁচাত্তরের ঘাতক ও দালাল চক্রের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। তারা নতুনভাবে ঘোঁট পাকাচ্ছে। এখানেই বঙ্গবন্ধুর জাগ্রত অস্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রয়োজন। আশার কথা, তিনি এখন জাগ্রত। স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে বন্দিশালায় থেকে নেতৃত্বদানের মতো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামেও তিনি কবরে শুয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আশা করা যায়, এই সংগ্রামেও বাংলার মানুষ জয়ী হবে।

শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক দলের শক্তির উৎস বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ। তাই বঙ্গবন্ধু এখন দলমত-নির্বিশেষ সব বাঙালির নেতা। এক বুদ্ধিজীবী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সামনে এখন অনেক সমস্যা ও সংকট। কিন্তু তার তিনটি রক্ষাকবচ আছে। বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রনাথ ও শেখ মুজিব। বাঙালির সব বিপর্যয়ে তাঁরা ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন। ’ ৪২ বছর আগের ট্র্যাজেডি থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিই, তাহলে ৪২ বছর পরের বিপর্যয়ও আমরা ঠেকাতে পারব। আওয়ামী লীগসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের দিকে ফিরে যেতে হবে। ১৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়নি। এই সত্যটি আমাদের মেনে নিতে হবে।

লন্ডন, সোমবার, ১৪ আগস্ট ২০১৭
প্রথম প্রকাশ: কালের কণ্ঠ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত