বিতর্ক চর্চা যুগে যুগে

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৭, ১৩:৩৪

একগুঁয়েমি, মুর্খ্যতা এবং পেশী শক্তির সমন্নয়ে হয় তর্ক। বিপরীতে যৌক্তিক সঠিকতথ্য সমৃদ্ধ জ্ঞানের উপস্থাপনে হয় বিতর্ক। বিতর্ক একটি শিল্প। বিতর্কের মাধ্যমে একজন বিতার্কিক যেকোন বিষয় গভীরভাবে আত্মস্থ এবং বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ বা উপস্থাপন করতে শিখে। মানবসভ্যতার ইতিহাস হলো শিল্পের ইতিহাস। শুধুমাত্র শিল্পের পার্থক্য দ্বারাই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম জীব হিসেবে বিবেচিত। আবহমানকাল থেকেই মানুষ বিতর্কে লিপ্ত হয়ে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সে তার নিজস্ব দর্শন ও মতকে যুক্তি-উপস্থাপনা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। কিন্তু কেন? মানুষ কেন বিতর্ক করেছিলো। মানব সভ্যতা বিকাশের সাথেই বিকশিত হয়েছে মানুষের যুক্তিবোধ। বহু প্রাচীনকালে গ্রিসের সফিস্টদের মাঝে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিতর্কের চর্চা শুরু হয়েছিল। ধারণা করা হয় খৃষ্টপূর্ব ৪৮৯ প্রাচীন গ্রীসের সোফিস্ট (Sophist) সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বিতর্কের প্রকাশ। সোফিস্ট প্রোটাগোরাস (Protagoras- 490-420 BC) এর মাধ্যমে বিতর্কের গোড়াপত্তন  এবং মহামতি দার্শনিক সক্রেটিসের (470-399 BC) মাধ্যমে বিতর্ক জনপ্রিয়তা এবং প্রায়োগিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

তৎকালীন সময় রাজপুরুষ ও বিজ্ঞজনেরা রাজনীতির রুপ রেখা নির্নয়ে বিতর্ককে প্রধান্য দিতেন। অনেকেই মনে করেন রাজনীতির এই পটভুমিকে নিয়ে বিতর্কই এক সময় সংসদীয় বিতর্কের জন্ম দেয়। জ্ঞান উম্মেষের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত যুক্তিই তাকে পথ দেখিয়েছে সত্য ও সুন্দরের সন্ধান পেতে। আর যুক্তিই হল বিতর্কের প্রান। বিতর্ক হলো একটি প্রাচীনতম শিল্প (Debate is an ancient art)। বিশ্বের দৃঢ়, অভিজাত, শক্তিশালী, সৃজনশীল, সমাদৃত ও যৌক্তিক শিল্পসমুহের মধ্যে এটি অন্যতম। সক্রেটিস বলেছিলেন, “A life unexamined is not worth’’ যে জীবনে জিজ্ঞাসা নেই, তা কোন জীবন নয়। বির্তকের জন্ম জিজ্ঞাসা থেকে আমি যা জানি তা চূড়ান্ত নাও হতে পারে। আমরা জানাকে বিপরীত চিন্তা থেকে যাচাই করে নেয়ার নামই বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শিক্ষাবিদ নরম্যান কাজিন বলেছেন, “The first purpose of education is to enable a person speak clearly and confidently.” যদি স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলার সামর্থ্য অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য হয় তবে এই উদ্দেশ্য অর্জনের অন্যতম উপলক্ষ্য হলো বিতর্ক। বিতর্ক যুক্তিবাদী চেতনার বিকাশ ঘটায়। বিতর্কের মাধ্যমে যুক্তির ভিত্তিতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই যুক্তিবাদী ও আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিতর্ক হল একটি শিল্প, এটি চর্চার বিষয়। যুক্তি, অনুসন্ধান, উপলব্ধি, পরম সহিষ্ণুতা তথা অন্যের মতামতকে সম্মান প্রদর্শনের চর্চার মাধ্যমে বিতার্কিকদের চারিত্রিক উন্নয়ন সাধিত হয়।

ইংরেজি প্রতিশব্দ  “Debate” যার আভিধানিক অর্থ তর্কাতর্কি, বাদানুবাদ, বিতর্ক, বাদপ্রতিবাদ, বাগবিতন্ডা ইত্যাদি। বিতর্ক শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই- 'বি' যার অর্থ বিশেষ এবং 'তর্ক' যার অর্থ বাদানুবাদ। অর্থাৎ বিশেষ বাদানুবাদ বা আলোচনাকে বিতর্ক বলে। বিতর্কের প্রেক্ষাপটের তুলনায় বর্তমান কালের বিতর্ক চর্চার মধ্যে ব্যপক পার্থক্য রয়েছে।  প্রাচীন কালে বিতর্ক চর্চা  ছিলো জীবনভিত্তিক। বর্তমানে বিতর্ক একটি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করার কারণে সমাজের প্র্যাকটিকেল জায়গাগুলোতে বিতর্ক করার পূর্বে ডিবেটিং ক্লাবগুলোর মাধ্যমে নিজের উপস্থাপনা ও যুক্তি প্রদানের যোগ্যতাকে শাণিত করে নেয়ার একটি সুযোগ থাকে। তাই অতীতে মনে করা হতো উপস্থাপনা বা বক্তৃতা একটি খোদাপ্রদত্ত বা ইনহেরেন্ট বিষয়। কিন্তু বর্তমানে চাইলে যে কেউই একজন বিতার্কিক হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। সমাজের একটি সচেতন অংশ হিসেবে নিজেকে পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশ তথা জাতিগঠনের জন্য বিতর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনি একজন পেশাদার বিতার্কিক হতে না চাইলেও অথবা বিতর্কশিল্পকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে না চাইলেও বিতর্কচর্চার মাধ্যমে অনেকগুলো উপকার পেতে পারেন। যা আপনার কর্মজীবনকে করে তুলবে গতিশীল ও প্রাণবন্ত। সমাজের বুকে নিজেকে একটি ভিন্ন  মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।  নিজে আলোকিত  হবেন আপনার আশেপাশে আলোকিত করবেন।

শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানের ভান্ডারকে বিকশিত করে। সেই সাথে একজন শিক্ষার্থীকে নেতৃত্বদানের মতো যোগ্যতা তৈরী করতে সাহায্য করে। শুধু তর্কের খাতিরে তর্ক নয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আলোচনা সমালোচনা হয়। ফলে অংশগ্রহনকারী ও শ্রোতা, উভয়ের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে। বিতর্কে অংশগ্রহণকারী ছাত্র/ছাত্রীদের কথা বলার জড়তা কেটে যায়। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়ে তেমনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশি যুক্তি দিয়ে কথা বলার অভ্যাস গড়ে ওঠে। অনেকের সামনে কথা বলতে হয় বলে বিতার্কিকদের সাহস বাড়ে। তারা দাঁড়িয়ে কথা বলতে ভয় পায় না। দলীয় চেতনা জেগে ওঠে।

বিতর্ক হচ্ছে যুক্তির খেলা। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিপক্ষকে যুক্তি দিয়ে ঘায়েল করার কৌশল শেখে। যে কোন বিষয়ে দ্রুত যৌক্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ে। বিতর্ক করলে যেমন মনোযোগী শ্রোতা হওয়া যায়, তেমনি বাড়ে সময় সচেতনতা। মূলত বিতর্ক কোনো অনুষ্ঠান নয়, বিতর্ক হচ্ছে চর্চার বিষয়। এই চর্চা হবে প্রতিভা, মেধা-মননের যুক্তির চর্চা। এই চর্চার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীসহ বিতার্কিকদেরকে যুক্তি অনুসন্ধান, যুক্তির উপলব্ধি, পরমতসহিষ্ণুতা তথা অন্যের মতামতকে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রস্তুত হতে হবে। তাই প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ যুগেযুগে বাস্তবতার নিরিখে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য বিতর্ক চর্চা ছিল, আছে এবং থাকবে।

লেখক: সাবেক বিতার্কিক ও সরকারি কর্মকর্তা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত