পিক্সেল কালচার, আধিপত্যের নয়া যুগ

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৭, ১৪:৩২

সাধারণত সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি মার্জিত রূচি বা অভ্যাসগত উৎকর্ষ। মানুষ সমাজ থেকে যা কিছু অর্জন করে তাই সংস্কৃতি। মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, আচার-ব্যবহার, ভাষা, খাওয়া-দাওয়া, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, পোষাক-পরিচ্ছদ, সৃজনশীল প্রকাশ এ সবকিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সংস্কৃতি যেহেতু মানুষের যাপিত জীবনের সাথে ঘনিষ্টভাবে চলমান, সেহেতু সংস্কৃতি গতিশীল। 

আজ যা গতিশীল জীবনের অংশ তাই এক কথায় সংস্কৃতি। সংস্কৃতি নির্মিত হয় মানুষের শ্রমের মধ্য দিয়ে। জীবনগতির নানা পর্বে আছে ভাল আর মন্দের সহ-অবস্থান। আর তাই মানব জীবনের জন্য যা ক্ষতিকর তাকেও আমরা সংস্কৃতি বলি ঠিকই, তবে তার আগে যুক্ত করি ‘অপ শব্দটি। মানুষ নানা সভ্যতার নির্মাতা। সভ্যতা বিনির্মাণে রয়েছে মানুষের সৃজনশীল উদ্ভাবন। উদ্ভাবন হয়ে ওঠে সময়ের চলমান সংস্কৃতি। উদ্ভাবন বা আবিস্কার এক জায়গায় থেমে থাকে না। 

প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয় এবং মানুষের জীবনের শ্রমের সাথে যুক্ত হয়। তাই শ্রমবিচ্ছিন্ন যে প্রাথমিক উদ্ভাবন তা পরিণত হয় ঐতিহ্য হিসেবে। যেমন, খেয়া পারাপারের জন্য বা জলপথে যাতায়াতের জন্য নৌকা ছিল বাহন। এর সাথে যুক্ত হতো পাল, গুনটান আর মাঝির শ্রম। সে স্থলে যুক্ত হয়েছে আজ ইঞ্জিন। অচল হয়ে গেছে পাল, গুনটান আর একক বা একাধিক মাঝির শ্রম। পালতোলা নৌকা আজ শুধুই ঐতিহ্যের অংশ। 

ফিল্ম ক্যামেরার যুগ শেষ। ফিল্ম ক্যামেরাগুলো এখন ঐতিহ্যের জাদুঘরে। সেলুলয়েড সংস্কৃতিতে আমরা ছিলাম দুই দশক আগেও। সেখানে সেলুলয়েড ফিল্মের বিয়য়টিকে প্রযুক্তির ইতিহাসে নির্বাসিত হতে হয়েছে। যদিও ব্যয়সাপেক্ষ এ প্রযুক্তিকে মানুষ ব্যবহার করে সৃষ্টি করেছে চলচ্চিত্র। 

পৃথিবীর প্রথম ডিজিটাল স্টিল ক্যামেরা বের করে বিশ্বখ্যাত সনি কোম্পানি। ক্যামেরাটির নাম রাখা হয়েছিল মেভিকা। ১৯৮১ সালের কথা। তবে প্রথম মেগাপিক্সেল ক্যামেরা আবিষ্কার করে কোডাক, ১৯৮৬ সালে । আর থেমে থাকা নয়। এরপর থেকে চলতে থাকে ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যার ফলাফল আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর সব ক্যামেরা।

প্রসঙ্গটি পিক্সেল কালচারের। আমাদের চলমান সংস্কৃতির সাথে এখন যুক্ত হয়েছে পিক্সেল। সময়টি পিক্সেল সংস্কৃতির। ইংরেজিতে যাকে আমরা বলে থাকি, পিক্সেল কালচার। পিক্সেল কী? এক কথায় পিক্সেল হলো একটি ইমেজের ক্ষুদ্রতম অংশ। এই বর্গাকৃতির পিক্সেল খালি চোখে দেখা যায় না। ডিজিটাল ক্যামেরার একটি ইমেজ বা স্থিরচিত্র তৈরি হয় অনেকগুলি পিক্সেল দ্বারা। এ রকম ২৫ টি স্থির চিত্র এক সেকেন্ডে চলমান করলে সৃষ্টি হয় চলচ্চিত্র। ক্যামেরা, কম্পিউটার, সিডি, পেনড্রাইভ, মেমোরি কার্ড ইত্যাদি আসলে কোন ইমেজ বা ছবি সংরক্ষণ করে রাখে না, এগুলো সংরক্ষণ করে ডাটা অর্থাৎ বাইনারি তথ্য। যেহেতু বাইনারি, সেহেতু সাংখ্যিক। সাংখ্যিক এর ইংরেজি হল ডিজিটাল। 

আমাদের চারপাশে যেখানেই তাকাই সেখানেই পিক্সেল আধিপত্য। বিশ্বজুড়ে অন্তর্জাল বা ইন্টারনেট আমাদের যুক্ত করেছে এই পিক্সেল কালচারের সাথে। আপনার আমার সবার হাতে এখন পিক্সেল ধারণ করার যন্ত্র। যোগাযোগের জন্য আমরা ব্যবহার করছি মোবাইল ফোন। দোকানে গিয়ে আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী কিনে আনছি মেগাপিক্সেল ফোন। তারপর যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা, রাগ-অভিমান সবকিছু তুলে দিচ্ছি অন্তর্জাল বা ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলিতে। এভাবেই আমাদের চলমান জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে একধরনের সংস্কৃতি নির্মাণ করে চলেছে পিক্সেল। রাগ-অভিমান বা প্রতিবাদ সবকিছু এখন পিক্সেল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের কাছে। গণমাধ্যমের বিকল্প মাধ্যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই নয়া প্রযুক্তি। রাষ্ট্র, তার বিপক্ষে যায় এমন কিছু নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে, জারি করেছে ‘৫৭ ধারা শাস্তি দেবার নতুন আইন। যার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সকল ধরনের প্রতিবাদের পথকে রুদ্ধ করার নয়া কালো আইন জারি আছে দেশে। তবুও প্রতিবাদের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মানুষ প্রতিবাদ করবেই। মানুষের যৌক্তিক অনুভূতিকে কখনো আইন দিয়ে দাবিয়ে রাখা যায় না। 

লড়াই কি শুধু ভার্চুয়াল দুনিয়াতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে? এমন আশঙ্কা অনেকের ছিল। তা মিথ্যা প্রমাণিত করেছে ‘গণজাগরণ’ আন্দোলন। পিক্সেল বার্তা কিন্তু নামিয়ে এনেছে সাধারণ মানুষকে সারা দেশের রাজপথে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতি আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধ্য করেছিলো। নানান সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে এখন নতুন হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে পিক্সের বা মেগা পিক্সেল হাতিয়ার। বর্তমানে প্রত্যেকের হাতে হাতে মেগা-পিকজেল ক্যামেরা বা মেগা পিক্সেল হাতিয়ার। 

এমন একটি শক্তিশালী হাতিয়ারকে দিয়ে আমরা কি করতে পারি? আমরা ছবি বা চলচ্চিত্র বানাতে পারি, যা জনসাধারণকে সমাজ সচেতন করতে পারে। ছবির কাজটি প্রতিনিয়ত মানুষ করছে তার জীবনের নানান ঘটনাকে ধরে রাখতে। এখন প্রয়োজন চলচ্চিত্র নির্মাণ। যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে, সব মানুষ কি আর চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবে? হয়তো সব মানুষের কাজও এ’টি না। 

তবে, বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড এর মাধ্যমে সব মানুষের দৃষ্টিগ্রাহ্য করা সহজ হবে। আবার কেউ কেউ সিনেমা না বানালেও কোন ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে পারে, দিতে পারে ইউটিউব চ্যানেলে। শেয়ার হতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। একটি পথ নাটক হচ্ছে রাজপথে। কেউ ধারণ করে নিল সেটি তার মেগা পিকজেল ক্যামেরায়। দিয়ে দিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। হাজারো মানুষের কাছে তা দৃষ্টিগোচর হলো। অল্প থেকে ব্যাপক মানুষের কাছে চলে গেলো নতুন বক্তব্য। বর্তমান সময়ে আমাদের মনোজগৎ ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েছে পিক্সেল সংস্কৃতিতে। 

তাই আমাদের প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক শিল্পনির্মাণ ও প্রচার, যা কিনা মানুষের মনজগতকে প্রভাবিত করতে পারে এবং একধরনের জনমতও গঠন করতে পারে। যদি এ কাজটি সুচিন্তিতভাবে আমরা করতে ব্যর্থ হই, তবে বাণিজ্যের আগ্রাসী পণ্যগেলার পিক্সেল আধিপত্য গ্রাস করে নেবে গোটা জাতিকে। যেমন করে বাংলা চলচ্চিত্র সুস্থ থেকে অসুস্থ ধারায় নিপতিত হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে পিক্সেল জগতে যা ঘটবে তা হবে বিগত সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। লড়াইটি শিল্প ও সংস্কৃতির এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের নতুন অনুষঙ্গগুলোকে কাজে লাগাতে হবে সমাজবদলের নয়া হাতিয়ার হিসেবে।

লেখক: চলচ্চিত্র ও চারুকলা সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত