ঠিক তখন নেমে আসবে শকুনের দল

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:৩২

 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত লুঠের পেছনে ছিল রথসচাইল্ড আর মিয়ানমারের মাটি যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে তখন শকুনের মত অপেক্ষারত পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম ব্যবসায়ী মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস। ২০১৩ সাল থেকে মিয়ানমারে গণতন্ত্র নামক অদ্ভুত এক বস্তু প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবার জন্য নিরলস কাজ করে চলেছে মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস পরিচালিত 'বার্মা টাস্ক ফোর্স'।

মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পেছনে স্পষ্টতই বৈশ্বিক ঝানু খেলোয়াড়গণ কাজ করছেন। বর্তমানে চলমান মিয়ানমারের ভয়ঙ্কর ধরণের রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী লবির ম্যানেজমেন্ট পলিসির অংশবিশেষ মাত্র । হিসেবটি খুবই পরিচিত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে ৷ যেকোনো অজুহাতে অশান্তি সৃষ্টি করো, রিজিওনাল কনফ্লিক্টকে ধোঁয়া দাও, পারলে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করো, দেনায় ডুবে যাক সেই দেশ এবং এই সুযোগে দেশটির স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ লুফে নাও। ব্যস, একেবারে কমন ফর্মুলা।

কোনো দেশে যখন আগুন জ্বলবে, রক্তে ভেসে যাবে চারিদিক, অসহায় মানুষের আর্তনাদে যখন আকাশ ভারী হয়ে উঠবে, ঠিক তখনই নেমে আসবে শকুনের দল । পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী জর্জ সোরোসও মিয়ানমারে ঠিক এ কাজটিই করে চলেছেন। রক্তপাত, অশান্তি শুধুমাত্র একটি দেশের মানুষের জীবন এবং ইনফ্রাস্টাকচারের ক্ষতি করে না, দেশটির অর্থনীতিকেও তছনছ করে দেয়। এর ফলে দেশ ডুবে যায় ঋণের অতল জলে ৷ আর এই ঋণমুক্তির উপায় হিসাবে মোক্ষম সময়ে অবতীর্ন হন মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস। অন্যদিকে চলতে থাকে সমূলে উচ্ছেদ, নিশ্চিহ্ন করা হতে থাকে রোহিঙ্গাদের মতন জনগোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক বিবেক এই খেলা না বুঝে সু কি’র নোবেল ফেরতের দাবী জানাতে থাকবে -আর মিয়ানমারের গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে ধনকুবের জর্জ সোরোস পরিচালিত ‘বার্মা টাস্ক ফোর্স’ মিয়ানমারের স্বাধীনতা হরণ করেই চলবে প্রতি মুহূর্তে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতার পেছনের কারণ মূলত তিনটি। প্রথমত, এটি চীনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক খেলা, কারণ রাখাইন রাজ্যে চীনের একটি বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম চরমপন্থী সংগঠনগুলোকে উস্কানি দেয়া। তৃতীয়ত, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ( মিয়ানমার এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া) মধ্যে খুব সুক্ষ্মভাবে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বীজ বপন করা। 

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতা হ্রাস করার জন্য বাহ্যিক খেলোয়াড়গণ শতাব্দীর দীর্ঘ এই সংঘাত জিইয়ে রেখে চলছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হল রাখাইন রাজ্যের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে হাইড্রোকার্বনের বিশাল মজুদ। এখানে ‘থান শ’ নামে এক বিশাল গ্যাসক্ষেত্র আছে। এছাড়া রাখাইন রাজ্যের উপকূলে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের বিশাল ভান্ডার। ২০০৪ সালে রাখাইন রাজ্যের বিপুল জ্বালানি সম্পদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এটি চীনের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ২০১৩ সালে চীন এই রাজ্যের সঙ্গে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন সংযোগ সম্পন্ন করে। এই পাইপলাইন কিউকফিয়ূর বন্দরের সঙ্গে চীনের কুনমিং শহরের ইউনান প্রদেশকে সংযুক্ত করেছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে মালাক্কা স্ট্রেইট ব্যবহার করে বেইজিং, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে এবং গ্যাস পাইপলাইন মিয়ানমার থেকে চীনে হাইড্রোকার্বণ সরবরাহ করে। ২০১১-১২ সালে চীন-মিয়ানমার শক্তি প্রকল্পের উন্নয়নের সময় কাকতালীয়ভাবে রোহিঙ্গা সংঘাত আবারো চরমে উঠে। এ সময় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রক্তের পথ পাড়ি দিয়ে দেশ থেকে পলায়ন করে।

রোহিঙ্গা সমস্যার পেছনে অভ্যন্তরীণ কিছু কারণ থাকলেও এর পেছনে বাহ্যিক উস্কানি অস্বীকার করা যায় না। মিয়ানমারে চলমান এই অস্থিতিশীলতায় চীনের জ্বালানি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং এটি বেইজিংয়ের পকেটে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করবে। আবার অন্যদিকে চীনের আরেক প্রতিবেশি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংকটের মধ্যবর্তী স্থানে পড়ে চীন হয়তো ক্রসফায়ারে পড়ে যেতে পারে। একটি অঞ্চলের মধ্যে ধর্মীয় সহিংসতা সৃষ্টি করে বাহ্যিক খেলোয়াড়গণ সার্বভৌম রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নেয় এবং তাদের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করে। অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং একটি দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী জর্জ সোরোস ২০০৩ সালে ‘ইউএস টাস্ক ফোর্স গ্রুপে’ যোগদান করেন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বৈদেশিক সম্পর্ক পরিষদ’র ডকুমেন্টে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমারের জন্য পরিবর্তনের সময় এসেছে। বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য ব্যতিত মিয়ানমার গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। ধনকুবের জর্জ সোরোস যখন মিয়ানমারে আসেন, তিনি প্রথমেই ধর্ম, উপজাতি এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের ওপর মনোযোগ দেন। এরপর তিনি এই তিনটি ইস্যু বা এর মধ্যে যে কোন একটিকে ব্যবহার করে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলার কাজে সলতে পাকানো শুরু করেন।

মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস পরিচালিত ‘বার্মা টাস্ক ফোর্স’ মিয়ানমারের অনেক সংস্থার অর্থায়ন করছে। ২০১৩ সাল থেকে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠির ওপর গণহত্যা বন্ধের আহ্বানও জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের ইতিহাসে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জর্জ সোরোসের হস্তক্ষেপ গভীর থেকে আরও গভীরতর হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও অদ্ভুত এই খেলা বোঝা একটু জটিলই বটে ৷ হাঙ্গেরি বংশোদ্ভুত এই মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে ইতালির রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারিয়ো সোমোসা জাতীয় অর্থের অপব্যবহার, ইইউসহ অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং বর্ণবাদের অভিযোগ আনেন।

কে এই জর্জ সোরোস ? ১৯৪৪ সালে যখন হিটলারের জার্মানি হাঙ্গেরি দখল করে নেয় তখন তিনি মাত্র তের বছরের বালক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে হিটলারের থাবা থেকে হাঙ্গেরি যখন সোভিয়েত ভাল্লুকের নখরে, তখন সোরোস চলে আসেন ইংল্যান্ডে। এখানেই শুরু হয় অভিবাসী এক নিঃসম্বল তরুণের জীবন সংগ্রাম। গোঁড়া ইহুদি এক চাচার পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে সামান্য কিছু মাসিক ভাতার ব্যবস্থা লাভ করেন তিনি। দারিদ্র্য দমাতে পারেনি সোরোসকে। তিনি ভর্তি হন লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকসে। ১৯৫২ সালে স্নাতক হন তিনি। পেটের দায়ে ছাত্রাবস্থায় রেলওয়ের কুলিগিরি থেকে শুরু করে হোটেলের ওয়েটার, এরকম আরও অনেক কাজ করেছেন তিনি।

স্নাতক হওয়ার পর বহুকষ্টে ইংল্যান্ডের আর্থিক জগতে ঢোকার সুযোগ পান তিনি। কাজ শুরু করেন বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকে। ১৯৫৬ সালে তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন। এখানেও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোসের ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন’ বিনামূল্যে ড্রাগ সরবরাহ করে থাকে এবং এই সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে বিনামূল্যে ড্রাগ সরবরাহের অন্যতম সমর্থক। নিজস্ব এনজিওকে ব্যবহার করে শরণার্থীদের সহায়তা ও মানবিক কাজের পেছনে জর্জ সোরোস একটি বিপ্লবের সূচনা করেন ৷ টার্গেট করা অঞ্চলে মার্কিন মদদপুষ্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করাই তার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা থাকে।
( বিদেশী একাধিক জার্নালের ছায়া অবলম্বনে অনূদিত )

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত