সৃজনশীল সভ্যতার বিকাশে ছাপাখানা

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৯:৫৭

যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশে চাকা ও মানুষের সৃজনশীল সভ্যতার বিকাশে ছাপাখানা স্বমহিমায় গুরুত্বপূর্ণ। পুঁথিগত বিদ্যা ছিল অল্প কিছু মানুষের কুক্ষিগত। মুদ্রণযন্ত্রই প্রথম সেই অবস্থায় বদল আনে। মনের ভাবপ্রকাশের জন্য কোনো প্রচলিত ছন্দ-অন্ত্যমিলের কাঠামোর তোয়াক্কা না করে, লিপিকরের ভরসায় বসে না থেকে তা ব্যক্তির মুখের ভাষাকে নিমেষের মধ্যে শত সহস্র অনুকরণ করে ছড়িয়ে দিতে শুরু করল ক্রমাগত। লিপিকর, কথকের বেড়া টপকে মুদ্রণযন্ত্রকে আশ্রয় করে লেখক ও পাঠকের সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটল এভাবেই ৷

ছাপাখানার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিষয়ে মত-পথের বিভেদ লক্ষণীয়। তবে ইতিহাসের সত্য হচ্ছে-জার্মানিতে জোহান গুটেনবার্গ সর্বপ্রথম ধাতুনির্মিত স্থানান্তরযোগ্য ২৬টি অক্ষর দিয়ে টাইপ আবিষ্কার করে পশ্চিমা পৃথিবীতে মুদ্রণযন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন করেন। প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কারের কাহিনী ঘাটলে জানা যায় এটি আবিষ্কার করেন গুটেনবার্গ। গুটেনবার্গ পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। গুটেনবার্গ তখনকার সহজলভ্য জিনিসগুলো দিয়ে একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন যা টাইপ করতে সক্ষম,যা ছিল ছাপার যন্ত্রের প্রাথমিক রূপ। এই ছাপাখানাই কয়েক দশকের মাঝে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর দুইশটিরও বেশি শহরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বলাই বাহুল্য, বর্তমানের আধুনিক ছাপাখানা যেই পরিমাণ কাজ করতে সক্ষম, এর চেয়ে অনেক অনেক গুণ কম ছাপার কাজ করতে পারত সেইসময়ের ছাপাখানা। শুরুর দিকে ১৫০০ টি ছাপাখানা মিলে উৎপাদন করতে পারতো ২০ মিলিয়ন কপি, পরে ষোড়শ শতাব্দীর দিকে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০-২০০ মিলিয়ন কপিতে।গুটেনবার্গ দক্ষতার সঙ্গে ছাপার এই পদ্ধতিকে উন্নত করেছিলেন। এক্ষেত্রে ছাপার মূল দুটি কাজকে আলাদা করা হয়েছিল। একটি হলো টাইপসেটিং, অপরটি হলো প্রিন্টিং। 

১৪৫৫ সালে তিনি টাইপ পিস হিসেবে সীসার তৈরি ধাতব ব্লক ব্যবহার করেছিলেন, যা আজও অনুসৃত হয়। টাইপ করার এই রীতিটি গুটেনবার্গ পূর্ববর্তী ইউরোপেও প্রচলিত ছিল দ্বাদশ শতাব্দী বা ধারণা করা হয় এরও আগে থেকেই৷ মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারে গুটেনবার্গের স্বীকৃতি সর্বাধিক হলেও এক্ষেত্রেও চীনাদের বাস্তবসম্মত দাবি আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১২২১ সালে চীনে সর্বপ্রথম কাঠের টাইপ সাজিয়ে বই ছাপানো হয়। বাইরের বিশ্বের কেউ এর সঙ্গে তখন পরিচিত ছিল না। এর আগেও ৮৬৮ সালে চীনে বই মুদ্রিত হয়েছিল। এরপর ১৩৯২ সালে কোরিয়ার ধাতব হরফে মুদ্রণের কাজ হয়েছিল বলে জানা যায়।

মুদ্রণের প্রাচীন কিছু রীতির অস্তিত্ব চীন, জাপান, মিসর কিংবা কোরিয়ায় মিললেও এ কথাও সত্য, ইউরোপীয়রাই আধুনিক মুদ্রণ পদ্ধতির আবিষ্কারক। সম্ভবত ১৪৫০ সালে ইউরোপে সর্বপ্রথম নেদারল্যান্ডে ব্লক বই তৈরি হয়েছিল। ইংরেজি ভাষায় ইংল্যান্ডে প্রথম গ্রন্থ মুদ্রণ করেছিলেন ইউলিয়াম ক্যাক্সটন। যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রণযন্ত্র প্রবর্তিত হয়েছিল ১৬৩৮ সালে। গুটেনবার্গ শুধু ছাপাখানাই স্থাপন করেননি, তিনিই প্রথম তৈলাক্ত কালির ব্যবহার করেন।

গুটেনবার্গের আগেও ছাপার বিভিন্ন রকম পদ্ধতির অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। ইতিহাসবিদের মতে, ১২২১ সালে চীনে সর্বপ্রথম কাঠের টাইপ সাজিয়ে বই ছাপানো হয়। বাইরের বিশ্বের কেউ এর সঙ্গে তখন পরিচিত ছিল না। এর আগেও ৮৬৮ সালে চীনে বই মুদ্রিত হয়েছিল। পৃথিবীর প্রথম ব্লক বই—'হীরক সূত্র' নামের বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থটি কাঠের ব্লকের সাহায্যে তুতগাছের ছাল দিয়ে তৈরি কাগজের ওপর ছাপা হয়েছিল। ছবি ও হরফ তৈরি হয়েছিল কাঠ খোদাই করে। মুদ্রাকরের নাম ওয়াং চিয়েং। বইটি ষোল ফুট লম্বা আর এক ফুট চওড়া। বইটিতে মাত্র দুটি পাতা। চীনের পর একই প্রযুক্তিতে জাপানে দু-শ বছর পর মুদ্রিত হয় 'ধরণীসূত্র' নামের একটি বই। বিখ্যাত মুদ্রণ ইতিহাসবিদ টমাস ফ্রান্সির কার্টার-এর মতে, চীন থেকেই ইউরোপে মুদ্রণ শিল্পের প্রচলন হয়। মুদ্রণের প্রাচীন কিছু রীতির অস্তিত্ব চীন, জাপান, মিশর কিংবা কোরিয়ায় মেললেও একথাও সত্য যে, ইউরোপীয়রাই আধুনিক মুদ্রণপদ্ধতির আবিষ্কারক।

কাঠের ব্লক দিয়ে বহুদিন আগে ছাপার কাজ শুরু হলেও এশিয়াতে ১৫ শতকে বিশেষভাবে উড ব্লক প্রিন্টিং ছড়িয়ে পড়ে। এর মূল কারণ অবশ্য গুটেনবার্গের ছাপার আবিষ্কার এবং তৎকালীন আধুনিক পদ্ধতিতে ছাপা বাইবেল জনপ্রিয় হওয়া। বিভিন্ন ধরনের প্রচ্ছদে সে-সময় রঙের ব্যবহার করতে নানা ধরনের ডাই ব্যবহার করা হতো। চীনে সে-সময় বক্সউড নামে এক বিশেষ কাঠ পাওয়া যেত। সেই কাঠ ছাড়াও অলিভ কাঠ কাজে লাগত ব্লক তৈরি করতে। তবে কাঠের ব্লকে ছাপার কাজ অনেক বেশি আধুনিক হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতকে আরব ও মিশরে এটি ছড়িয়ে পড়ে। একাদশ খ্রিস্টাব্দে ব্লকে ছাপা চীনের একটি বই (মেটিরিয়া মেডিকা, ১ লক্ষ ৩০ হাজার পাতা) আজও বিশ্ব ইতিহাসের সম্পদ। পরবর্তীকালে কাপড়ের, বিশেষ করে সিল্কের ওপর ব্লক দিয়ে ছাপার কাজ প্রসার লাভ করে।

মুভেবল টাইপের ক্ষেত্রেও পথপ্রদর্শক চীন। মূলত ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে সং বংশের বাই শোং মুভেবল টাইপ তৈরি করেন। পরবর্তীকালে ধাতুর তৈরি টাইপ তৈরি হয় কোরিয়াতে ১২৩০ খ্রিস্টাব্দে। ১৩৭৭ খ্রিস্টাব্দে মুভেবল টাইপে ছাপা বইটি এই পদ্ধতিতে ছাপা সবচেয়ে পুরোনো বই। বলা যায়, গুটেনবার্গ প্রথম তাঁর টাইপের হরফ তৈরির ক্ষেত্রে মুভেবল টাইপই পেয়েছিলেন। ১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে গুটেনবার্গ ২৬টি ধাতুর তৈরি হরফ দিয়ে ছাপাখানা স্থাপন করেন জার্মানির মেনাজ শহরে। 

তিনি শুধু ছাপাখানাই স্থাপন করেননি, তিনিই প্রথম তৈলাক্ত কালির ব্যবহার করেন। ছাপাখানার প্রাকসূত্রের বিবর্তনের শেকড় এখানেই প্রোথিত। প্রথমে ধাতুর মুভেবল টাইপ এলেও সেই সঙ্গে খুব শিগগিরই আসে চীনেমাটির তৈরি টাইপ। তৈরি হয় সেই চীনে। এরপর কাঠের মুভেবল টাইপও তৈরি হয়। এরপর ১৭৯৬ সালে এল লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি। 

জার্মান লেখক ও অভিনেতা অ্যালোয়িস সেনেফেল্ডার লিথোগ্রাফি নামে কম খরচে ছাপার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। লিথোগ্রাফিক পাথরের ওপর বিশেষ ধরনের রং, মোম বা তৈলাক্ত জিনিস মাখিয়ে ছাপার কাজ করা হয়। চুনা পাথরের ওপর লিথোগ্রাফিতে ছাপা ভালো হয়। লিথোগ্রাফির হাত ধরেই এল মাইক্রো এবং ন্যানোলিথোগ্রাফি প্রযুক্তি। এদের মাধ্যমেই এসেছে আজকের আধুনিক ছাপাখানা। এ যুগে বই ছাপার জগতে এক নতুন দিগন্ত এনে দিয়েছে ডিজিটাল এবং অফসেট প্রিন্টিং ব্যবস্থা। 

১৮৭৫ সালে ইংল্যান্ডে রবার্ট বার্কলে সর্বপ্রথম টিন ব্যবহার করে অফসেটে ছাপার কাজ শুরু করেন। অফসেট পদ্ধতি আধুনিক হয়ে সিটিপি (কম্পিউটার টু প্লেট) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত মুদ্রণের আধুনিকায়নের ফলে ব্যয় সংকোচন করে মুদ্রণপ্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে। এখন চলছে থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির যুগ। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যয় সাশ্রয় করে কম সময়ে অধিক পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব।

১৩৯৮ সালে জার্মানীর মেনজ্‌ শহরে গুটেনবার্গ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পেশায় ছিলেন স্বর্ণকার ৷ গুটেনবার্গ ১৪৩৯ সালে মুভেবল টাইপ বা স্থান অদলবদল করা যায় এমন হরফ দিয়ে মুদ্রণের পত্থতি আবিষ্কার করেন। অনেক পরিশ্রম ও বদলের পর ১৪৫০ সালে তিনি তাঁর ছাপাখানা খোলেন। প্রথমদিকে কিছু ধর্মীয় ইস্তাহার ছাপলেও ১৪৫৫ সালে তাঁর হাত দিয়েই প্রথম বই মুদ্রিত হয়। বইটি ছিল বাইবেল। আজ আমরা যাকে চিনি ‘গুটেনবার্গের বাইবেল’ নামে। গুটেনবার্গই প্রথম মুভেবল টাইপের ব্যবস্থার প্রচলন করে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের যুগের সূচনা করেন। আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই মানবসভ্যতা এই যন্ত্রটিকে চিনে নিতে দেরী করেনি। দেশ থেকে দেশান্তরে, সাম্রাজ্য থেকে উপনিবেশে, শিক্ষা বিস্তারে, ধর্মপ্রচারে এবং শাসনকার্যের সুবিধার জন্য কয়েকশো বছরের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে মুদ্রণযন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে।

১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টারে উইলিয়াম ক্যাক্সটন আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। প্রথম মুদ্রিত বই হল চসারের ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’। ব্যক্তিগতভাবে ক্যাক্সটন অনুবাদকের কাজ করতেন। তাঁর ছাপাখানার মুদ্রিত বইয়ের চার পঞ্চমাংশই ছিল ইংরেজি ভাষায় লেখা।

১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে Arnao Guillien de Brocar ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা করেন হিস্প্যানিক ভাষা-অঞ্চল স্পেনের Pamplona শহরে। কার্ডিনাল সিসনেরোর উদ্যোগে প্রথম বাইবেল ছাপা হয় ১৫১৪-১৫১৭ সালে, তাঁরই ছাপাখানায়। যদিও ছয়খণ্ডের এই বাইবেল প্রকাশিত হয় বেশ কয়েক বছর পরে, ১৫২১-১৫২২ সালে। এই বাইবেল ‘Complutense Polyglot Bible’ নামেই পরিচিত।

১৭৯৩ সালে মিশনারি উইলিয়াম কেরী ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষা-অঞ্চল শ্রীরামপুরে মিশন প্রেস স্থাপন করেন। বাংলা মুদ্রণের সূচনা ঘটে এই ছাপাখানা থেকে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের আগে ইংরেজিতে লেখা বই ‘এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’-এ বাংলা বর্ণমালার মুদ্রিত রূপ দেখা যায়। ১৭৭৮ সালে হুগলিতে সংস্কৃতজ্ঞ রাজকর্মচারী চার্লস উইলকিনস ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড এই বইটি লেখেন। বাংলা ভাষার উদাহরণের অংশগুলি হাতে এঁকে, পাঞ্চ কেটে, হরফ তৈরি করে ছাপা হয়। এই হরফের ভিত্তিতেই পঞ্চানন কর্মকার উইলিয়াম কেরীর প্রেসের জন্য ধাতব বাংলা হরফের সৃষ্টি করেন।

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আসামে কোনো ছাপাখানা ছিল না। আমেরিকান ফ্রি ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটির নাথান ব্রাউন এবং অলিভার কাটার দুটি মুদ্রণযন্ত্র নিয়ে আসামের সাদিয়ায় প্রেস স্থাপন করেন। পরের বছর ব্রনসন ও টমাস নামের আরও দু’জন এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। এরপরে ১৮৪০ সালে জয়পুরে এবং ১৮৪৩ সালে শিবসাগরে প্রেসটি স্থানান্তরিত হয়। অসমিয়া ভাষার প্রথম সংবাদপত্র ‘অরুণোদই’ এই প্রেস থেকেই প্রকাশিত হয়।

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান মিশনারিরা প্রথম ওড়িয়া ভাষায় বই প্রকাশ করেন। প্রথম সাময়িকপত্র ‘বোধদায়িনী’ বালেশ্বর থেকেই প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালে। প্রথম ওড়িয়া সংবাদপত্র ‘উৎকল দীপিকা’ ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়।

প্রথম মুদ্রিত দেবনাগরী লিপির ব্যবহার দেখা যায় Calcutta Gazette এ ১৭৯৬ সালের জুন মাসে। প্রথম হিন্দি সংবাদপত্র কলকাতা থেকে প্রকাশিত ১৮২৬ সালের ৩০শে মে, নাম ‘Udant Martand (The Rising Sun)’। প্রথম হিন্দি দৈনিক সংবাদপত্রও কলকাতা থেকে প্রকাশিত ১৮৫৪ সালে, নাম- ‘সমাচার সুধা বর্ষণ’।

Reverend Ellja Hoole ১৮২১-১৮২৮ এই কালপর্বে কন্নড় ভাষা-অঞ্চল বেঙ্গালুরু শহরে Wesleyan Mission Press গড়ে তুলেছিলেন। কন্নড় মিশনারির কাজে বহাল হলেন আরো দুই মিশনারি Jenkins এবং Garrett। এখানে প্রথমে ব্যাকরণ এবং অভিধানই ছাপা হত। কন্নড়-ইংরেজি অভিধান প্রকাশিত হয় ১৮৪৪ সালে এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের ভূমিকাসহ গীতা ছাপা হয় ১৮৪৬-১৮৪৮ কালপর্বে।
১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা তামিল অঞ্চল পুদুচ্চেরি দখল করলে জার্মান মিশনারি Johann Philipp Fabricius একটি মুদ্রণযন্ত্র হাতে পান। সেই যন্ত্রেই ১৭৭৯ সালে নিজের লেখা তামিল-ইংরেজি অভিধান ছাপেন তিনি। ভেপেরিতে স্থাপিত এই ছাপাখানার নাম- Vepery Press। ১৭৮৮ সালে Fabricius ইস্তফা দেওয়ার পর John Bunyan-এর লেখা Pilgrim’s Progress-এর তামিল অনুবাদও এখানেই ছাপা হয়েছিল ১৭৯৩ সালে।

গুটেনবার্গের ছাপাখানা স্থাপনের ঠিক একশত বছর পর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের গোয়ায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই ভারতবর্ষে ছাপাখানার ইতিহাসের শুরু। বাংলা ছাপা বইয়ে ছবি দেওয়া আরম্ভ হয়েছিল ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে। এই বছরে কলকাতার ফেরিস কোম্পানির প্রেসে ছাপা অন্নদামঙ্গলে ছয়টি ছবি ছিল। আর কোলকাতার শোভাবাজার পল্লীর অন্তর্গত বটতলায় প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করেন ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বনাথ দেব।

বাংলাদেশে পত্রিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রথম ছাপাখানা স্থাপিত হয় ১৮৪৭ সালে রংপুরে। 'রংপুর বার্তাবহ' নামের এই সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের জন্য এই প্রেসটি স্থাপন করেছিলেন রংপুরের কুণ্ডী পরগনার জমিদার কালীচন্দ্র রায়। এর কিছুকাল পর ১৮৪৮ সালে ঢাকায় প্রথম প্রেস স্থাপিত হয়। প্রাচীন এই মুদ্রণযন্ত্রটি কালের সঙ্গী হয়ে আজও ঢাকা নগর জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এই মুদ্রণযন্ত্রটি ধাতব ও ওয়াটারলো এন্ড সন্স নির্মিত অ্যালর্বিয়ন প্রেস। তবে ঢাকা থেকে বাংলা ভাষায় সৃজনশীল ধারার প্রথম বই 'নীলদর্পন' ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়। নীলদর্পনের হাত ধরে পূর্ববঙ্গে সৃজনশীল প্রকাশনার যাত্রা বলা যায়।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পুরনো ঢাকায় ব্যক্তি উদ্যেগে গুটিকয়েক সৃজনশীল ধারার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নওরোজ কিতাবিস্তান (১৯৪৮) স্টুডেন্ট ওয়েজ (১৯৫০) আহমদ পাবলিশিং হাউস (১৯৫৪) মাওলা ব্রাদার্স (১৯৫৪) বিউটি বুক হাউস (১৯৬২) খান ব্রাদার্স (১৯৬৬)সহ কয়েকটি প্রকাশনী সংস্থা আস্তে আস্তে সৃজনশীল বইয়ের আলোর বিচ্ছুরণ ছড়াতে থাকে। পাকিস্তান পর্বে পশ্চিমাদের বাঙালি বিদ্বেষী নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাভাষা, সাহিত্য, প্রকাশনা কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই প্রকাশকরা সৃজনশীল বইকে পাঠকদের হাতে তুলে দিয়ে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করতে থাকে।

স্বাধীনতার পর এ দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা নতুন মাত্রা পায়। আর এই পর্বে মুক্তধারার প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহার ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত ৩২টি বই দিয়ে ১৯৭২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির দক্ষিণ গেটে বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন। সেদিনের চিত্ত বাবুর সেই চট বিছানো বইয়ের পসরা নানা অনুষঙ্গের মিশেলে আজ অমর একুশে গ্রন্থমেলার মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আজ সৃজনশীল বই বছরে গড়ে প্রায় ৩৫০০ আইটেম প্রকাশিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিক্রি হয়েছে ১০ কোটি ১৪ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকার বই। তবে এই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব আমাদের জন্য খুব বেশি সুখ এনে দেয় না। কারণ প্রতিবেশি ভারতে ১৯০০০ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বছরে গড়ে বছরে ১ লক্ষের মতো বই প্রকাশ করে চলেছে। বিশ্বের ৮০টি দেশে বই রপ্তানি করে গড়ে প্রতিবছর ৫০০ কোটি ডলার উপার্জন করে ভারত। ইতোমধ্যে ভারতে প্রকাশনার অগ্রগতিতে কল্পমান বিশ্বে প্রকাশনার জগতের প্রথম কাতারের দেশ চীন। উল্লেখ্য, বর্তমানে চীনে প্রতিবছর ৮০০ কোটি কপি বই প্রকাশিত হয়।

বিশ্বজুড়ে প্রকাশনা সেক্টরের বর্তমান অর্থমূল্য সাড়ে আট লক্ষ কোটি টাকা। এখন প্রশ্ন আমাদের উদ্যমী তরুণ-তরুণীরা কেন এ বিশাল সম্ভাবনা হতে দূরে থাকবে?

সাম্প্রতিক কাগজের বইয়ের আবেদনকে ছাপিয়ে প্রচলিত হচ্ছে ইলেকট্রনিক বই বা ই-বুক। বন উজাড় করে বাঁশ, কাঠ কেটে মানুষ আর কাগজ তৈরিতে খুব একটা আগ্রহী নয়। যান্ত্রিক বই সংরক্ষণ পাঠ ও ব্যয় সুবিধাজনক। এর পরও যান্ত্রিক বইয়ের সুযোগ-সুবিধা যতই থাকুক না কেন পাঠকরা এখনো চায় এক-একটা করে পাতা উল্টিয়ে বই পড়তে। শুধু মনে নয় পাঠক ছুঁয়ে দেখতে চায় বইয়ের কালো হরফকে কাগজের জমিনে। পাঠকের আগ্রহ এবং চাহিদার কারণেই যান্ত্রিক বইয়ের পাশাপাশি কাগজের বই টিকে থাকবে স্বকীয় ঐতিহ্য নিয়ে, সেই সঙ্গে থাকবে মুদ্রণযন্ত্রও।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত