বাঙালি মানসের এই ঐতিহ্য জীবনানন্দের কাব্যিক বিশুদ্ধতার প্রতীক

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ১২:৫৩

ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুশয্যায় রাত জেগে সেবা শুশ্রূষা করেছিলেন ডাঃ দিলীপ মজুমদার। সেই মহৎ মানুষের গর্বিত ও সুযোগ্য সন্তান সৌভিক মজুমদার তাঁর নিজ বাড়ীতে বসে আড্ডার ফাঁকে স্মৃতিচারণ করছিলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে কেবলই শুনছিলাম।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দূর্ঘটনায় কবি জীবনানন্দ দাশ আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে গিয়েছিল কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়। গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে। তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন মেধাবী ছাত্র, পরবর্তীকালের যশস্বী বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিভাগীয় প্রধান শ্রী দিলীপ মজুমদার কবির শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কবির শিয়রে ছিলেন।

সমর চক্রবর্তী লিখেছেন, "এমন একটা দুর্ঘটনার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না৷ দুর্ঘটনার দিনই খবর পেয়েছিলাম একজন বন্ধুর কাছে৷ তবুও ভূমেন যখন মেডিকেল কলেজে পড়ে, আগে তার কাছেই গেলাম, কারণ মেডিকেল কলেজে নিয়ে গিয়ে থাকলে দেখাশোনার সুবিধে হবে ৷ ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিয়ে জানলাম সেখানে কবিকে আনা হয়নি। রাত্রিতে এসে ভূমেন জানাল যে, "পূর্বাশা" অফিস থেকে খবর এসেছে - কবি জীবনানন্দ গুরুতরভাবে আহত হয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে আছেন, আমরা যেন তাঁর সেবা শুশ্রূষার ব্যাপারে সাহায্য করি ৷ ভূমেনের ওপর ভার পড়ল ডাক্তারি পড়া ছাত্রের জোগাড় করা। এ প্রসঙ্গে দিলীপ মজুমদারের নাম সবার আগে উল্লেখ করতে হয় ৷ এর আগে তাঁর কথায় কবি ও কবিতার ওপর ব্যঙ্গের আভাষ পাওয়া যেত ৷ কিন্তু আশ্চর্য ভূমেন যখন তাঁকে রাত্রি জেগে সেবা করার অনুরোধ করল, তখন তিনি সুহৃদের মতো এগিয়ে এগিয়ে এসে রাত্রির পর রাত্রি বিনিদ্র থেকে সেবা করেছেন ৷ শেষের দিনে সুজিত ধরও সেবায় খুব আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন ৷" (বিভব, জীবনানন্দ জন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা)

কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাসও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন এবং আহত কবির সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিলেন যদিও এতে চিকিৎসার তেমন উন্নতি কিছু হয়নি। তবে জীবনানন্দের অবস্থা ক্রমশঃ জটিল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

জীবনানন্দ গবেষক ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ মনে করেন জাগতিক নিঃসহায়তা কবিকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল এবং তাঁর জীবনস্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা কবির মাথায় দানা বেঁধেছিল। তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। গত এক শত বৎসরে ট্রাম দুর্ঘটনায় কোলকাতায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র একটি। তিনি আর কেউ নন, কবি জীবনানন্দ দাশ ৷

অশোক মিত্র বলেন—‘প্রগতি’ (১৯২৬) ও ‘কল্লোল’ (১৯২৩) পত্রিকা যখন যাত্রা করে, কবির দিকে তাকানোর অবসর ছিল না কারণ তখন ব্যক্তিত্ববান বিচিত্র পুরুষরা সাহিত্য অঙ্গন মুখর করেছিল। কল্লোল লেখকদের নব্য মুখপাত্র ছিলেন নজরুল, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং তারাই সেই পুরুষ। কবির দিকে তাকানোর অবসর কেন ছিল না তার কারণ অনেক হতে পারে। এর মধ্যে বড় কারণ জীবনানন্দ একা আলাদা ছিলেন।তাঁর ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি স্বতন্ত্র ছিল। সেই যে ‘আমার নিজের মুদ্রাদোষে অমি একা হতেছি আলাদা’ এই ভঙ্গি তাঁকে স্বতন্ত্র আধুনিক করেছিল।

দেবীপ্রসাদ বলেন—‘পরিচয়’ (১৯৩১) পত্রিকায় যারা লিখতেন তারা নাকি শাহরিক ছিলেন, জীবনানন্দ সেখানে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। ‘কবিতা’ (১৯৩৫) পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে তুলে ধরলেও এর প্রথম কবি আগে সমর সেন পরে অমিয় চক্রবর্তী এবং বুদ্ধদেব নিজেই, জীবনানন্দ নয়। জীবনানন্দের শাহরিক যাত্রা প্রথম কাব্যেই ছিল আর পরেরগুলোতে তো ছিলই।

‘পরিচয়’ সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্তও জীবনানন্দবিরোধী ছিলেন। কবির মৃত্যুর পর সুধীন দত্তের অবস্থান ছিল কী দেখুন—‘খুব সকালে সবার চাইতে আগে এসেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শোওয়ার পোশাকেই মোটামুটি, পায়ে হালকা চটি, হাতে রজনীগন্ধার একটি গুচ্ছ, শবদেহের পাশে শুইয়ে দিয়ে এক মিনিট চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে একটি কথা না বলে যেমন এসেছিলেন তেমনি ধীর পায়ে জুতোর শব্দ না তুলে চলে গেলেন। সেই গাম্ভীর্য সেই শোক আর ছোঁওয়া গেল না’। (আলেখ্য : জীবনানন্দ, ভূমেন্দ্র গুহ) মানসিক স্বীকৃতি দিয়েই এমন নীরবে চলে গেছেন সুধীন দত্ত।

‘কবিতা’ পত্রিকায় যে কবিদের অগ্রাধিকার ছিল, তাঁরা তখন ভালো অবস্থানে থাকলেও জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে বাস্তবতা পালটে গেছে। বুদ্ধদেব বসু একজন সব্যসাচী হিসেবে যতটা সমাদৃত এখন ততটা কবি হিসেবে নন। জীবনানন্দই সমর, অমিয়দের থেকে আজ বাংলা কবিতায় সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

সজনীকান্ত দাসও তা-ই করেছেন। জীবদ্দশায় জীবনানন্দকে নাস্তানাবুদ করতে যখন উঠেপড়ে লেগে ছিলেন, কবির মৃত্যুর পর কী বলেছেন দেখুন—‘আজ কালধর্মে আমাদের মতি ও বুদ্ধির পরিবর্তন হইয়াছে তিনিও সকল নিন্দা-প্রশংসার ঊর্ধ্বে চলিয়া গিয়াছেন। পুরাতন যাবতীয় অশোভন বিরূপতা সত্ত্বেও একথা আজ স্বীকার করা কর্তব্য মনে করিতেছি যে, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যসাহিত্যের তিনি অন্যতম গৌরব ছিলেন। তিনি অকপটে সুদৃঢ়তম শ্রদ্ধার সহিত কাব্য-সরস্বতীর সেবা করিয়া গিয়াছেন। সহূদয় ব্যক্তিরা তাঁহার বক্তব্যের চাবিকাঠি খুঁজিয়া পাইয়া আনন্দ লাভ করিতেন। যাহারা পাইতেন না তাঁহারাই বিমুখ হইতেন। আমরা এই শেষোক্তদের দলে ছিলাম’। (জীবনানন্দ দাশ : উত্তরপর্ব, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত)

একেই বলে প্রায়শ্চিত্ত। জীবনানন্দের কাব্যের ‘চাবিকাঠি’ খুঁজে না পেয়েই ‘শনিবারের চিঠি’র ‘সংবাদ সাহিত্য’ বিভাগে কবির কবিতার অমূলক সমালোচনায় মুখর ছিলেন সজনীবাবু। বাঙালি দেরিতেই বোঝে, সজনীবাবুও তা-ই। জীবনানন্দ গবেষক অমলেন্দু বসু, যিনি ‘মাল্যবান’-এর ভূমিকা লিখেছেন, তিনি জীবনানন্দকে দেয়া রবীন্দ্রনাথের ‘serenity’ জাতীয় কাব্যিক বিশুদ্ধতার পরামর্শে লিখেছেন—‘রবীন্দ্রনাথের কাব্যঅভিব্যক্তিতে নিয়ত বহমান যে অপরিমেয়তল প্রশান্তির ধারা সে ধারা নিজ অভিব্যক্তিতে আয়ত্ত করেছেন এবং বাঙালি মানসের ও কাব্যের যে নিঃসংশয় ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথে বর্তেছিল তারই ধারক জীবনানন্দ’। (জীবনানন্দ দাশ : উত্তরপর্ব, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত)। মন্তব্যটি গভীর অনুসন্ধিত্সু।

বাঙালি মানসের এই ঐতিহ্য জীবনানন্দের কাব্যিক বিশুদ্ধতার প্রতীক কেননা ঐতিহ্য মাত্রেই বিশুদ্ধতা থাকে। মৃত্যুপরবর্তী জীবনানন্দ জীবিত জীবনানন্দের থেকে এভাবেই শক্তিশালী হয়ে ওঠেন তাঁরই কাব্যিক ঐশ্বর্যে। দেবীপ্রসাদ তাঁর লেখাতে শেষে বলেছিলেন, আগে যে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি পরে তা দেবার জন্য এত তোড়জোর কেন তবে কি তা ‘অতিস্বীকৃতি’! দেবীপ্রসাদ একথাটি বলেছেন আক্ষেপের সুরে। আসলে জীবিত জীবনানন্দকে একপ্রকার ভয়ই পেত তাঁর সমকালীন কবি-সমালোচকরা। কারণ, যে কাব্যশক্তি জীবনানন্দের ছিল তা তাঁর সমকালে আর কারো ছিল না। তাই এড়ানোটাই উপায় ছিল তাঁদের। পরে যে স্বীকৃতি দেয়া হয় তার পেছনে আগের একটা উপলব্ধির দূরত্ব ছিল। আর এখন একুশ শতক তো জীবনানন্দকে অবধারিত করেছে। আফসোস, কবি এ স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেননি। তবে আমরা তাঁর অনুরাগী পাঠক-সমালোচকরা আমাদের জীবদ্দশায় তাঁর স্বীকৃতি দেখে যেতে পারছি- এটাও বড় পাওনা।


সৌভিক মজুমদার ও লেখক মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত