ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

বাংলা ভাষা আন্দোলন-সংগ্রামের প্রথম স্ফুলিঙ্গ

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৭, ১২:৩০

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম জাতীয় রাজনৈতিক নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনিই প্রথম পাকিস্তানের গণপরিষদে (করাচিতে) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেছিলেন।

পাকিস্তান গণপরিষদে বক্তৃতাদান এবং কার্যবিবরণীর ক্ষেত্রে লেখা ছিল: ‘কেবলমাত্র উর্দু অথবা ইংরেজিতেই কোনো সদস্য ভাষণ দিতে পারবেন এবং পরিষদের কার্যবিবরণী উর্দু অথবা ইংরেজিতেই পরিচালিত হবে।’ পূর্ববঙ্গ তথা সেকালের পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাঙালি নামে নির্বাচিত কোনো ‘মুসলমান সদস্য’ এই ধারার পরিবর্তনের সামান্যতম উদ্যোগ যেখানে সেদিন নেননি, সেখানে পূর্ববঙ্গ থেকে নির্বাচিত প্রধান সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তার সাথীরা প্রেমহরি বর্মণ, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেদিন মুসলিম লীগের নেতাদের তীব্র আক্রমণের মুখে অমিত সাহস ও দূরদৃষ্টি নিয়ে বাংলা ভাষার দাবিকে তুলে ধরেছিলেন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উদ্যোগ নিয়ে গণপরিষদে কার্যবিবরণীর ভাষার ক্ষেত্রে সংশোধন এনে বলেছিলেন: ‘কার্যবিবরণী উর্দু অথবা ইংরেজি অথবা বাংলাতে পরিচালিত হোক’। অত্যন্ত নিরীহ এবং যুক্তিপূর্ণ একটি প্রস্তাব। উর্দুকে নাকচ করা নয়। উর্দুর সঙ্গে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে স্থান দেয়ার দাবি মাত্র।’

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার বক্তৃতায় গণপরিষদের সভাপতিকে সম্বোধন করে (ইংরেজিতে) বলেছিলেন: ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার এই প্রস্তাব আমি কোনো সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার মনোভাব থেকে পেশ করিনি। পূর্ববঙ্গ হিসেবে বাংলাকে যদি একটি প্রাদেশিক ভাষা বলা হয়, তবু একথা সত্য যে, আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা। ৬ কোটি ৯০ লক্ষ যদি সমগ্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিবাসীর সংখ্যা হয়, তাহলে তার মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে।

সভাপতি মহোদয়, আপনিই বলুন, একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার নীতি কি হওয়া সঙ্গত? একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ভাষা বলে সেই ভাষা। আর সে কারণেই আমি মনে করি আমাদের রাষ্ট্রের ‘লিংগুয়া ফ্রাংকা’ বা প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে বাংলা।

প্রিয় সভাপতি, আমি জানি এই কথা বলে আমি আমাদের রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক মানুষের আকুতিকেই প্রকাশ করছি। এই পরিষদকে আমি কোটি কোটি মানুষের সেই আকুতির কথা অবগত করাবার জন্যই আজ এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছি। কি অবস্থায় পূর্ববঙ্গের মানুষ আজ বাস করছে? ধরুন একজন সাধারণ মানুষের কথা, একজন কৃষকের কথা। সে যদি ডাকঘরে যায় এবং শহরে পাঠরত তার পুত্রকে ডাকযোগে কিছু টাকা পাঠাতে চায়, তবে ‘মানিঅর্ডার ফর্মের ভাষা’ সে বুঝতে অক্ষম হবে। কারণ মানিঅর্ডার ফর্মের ভাষা হচ্ছে উর্দু এবং ইংরেজি। একজন গরিব কৃষক যদি একখণ্ড জমি বিক্রির জন্য স্ট্যাম্প কিনতে যায়, তবে বিক্রীত স্ট্যাম্পের ভাষা সে বুঝবে না। স্ট্যাম্পের গায়ে কেবল উর্দু এবং ইংরেজিতেই স্ট্যাম্পের মূল্যের কথা মুদ্রিত আছে। গরিব কৃষক বুঝবে না কত টাকার স্ট্যাম্প সে কত টাকা দিয়ে ক্রয় করতে বাধ্য হলো। আমাদের রাষ্ট্রের, পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের এই হচ্ছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। অথচ যে কোনো রাষ্ট্রের ভাষা হতে হবে এমন যে, সাধারণ মানুষ সে ভাষাকে বুঝতে পারে। অথচ রাষ্ট্রের ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ তার এই গণপরিষদ তথা পার্লামেন্টের কার্যবিবরণী অনুধাবন করতে সক্ষম হবে না। কারণ এই সংসদের কার্যবিবরণীর ভাষা সে জ্ঞাত নয়। আমি তো বুঝিনি উর্দুর সঙ্গে ইংরেজি যদি ভাষার প্রশ্নে কার্যবিবরণী পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্মানের সঙ্গে ব্যবহৃত হতে পারে, তবে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষের ভাষা বাংলা কেন ব্যবহৃত হতে পারবে না?’

ঐ অধিবেশনে মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বাঙালি পার্লামেন্ট সদস্যদের একাংশ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দিলেও মুসলিম লীগ সমর্থিত এমপিরা এর বিপক্ষে অবস্থান নেন।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনের প্রথম দিনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটির ওপর দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। উত্থাপিত প্রস্তাব নিয়ে গণপরিষদে তুমুল তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়।ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এমন নিরীহ অকাট্য প্রশ্ন এবং যুক্তির জবাবদানের ক্ষমতা সেদিনের পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবটি ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এর উদ্দেশ্য।

এই প্রস্তাবের আরো বিরোধিতা করেন পূর্ব-বাংলার গণপরিষদের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর মনোভাব হচ্ছে একমাত্র উর্দূকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে’।

সেদিন পাকিস্তানকে মুসলিম রাষ্ট্র বলে আখ্যাদানকারী মূর্খ লিয়াকত আলী অচিরে কেবল যে তারই ‘স্বধর্মী’ ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন তাই নয়, লিয়াকত আলীর এমন আক্রমণাত্মক জবাব আজ ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। লিয়াকত আলী আজ বিস্মৃত। স্মরণীয়, বরণীয় আজ সেদিনের সেই প্রতিকূল পরিবেশে যথার্থই অসহায় তথাপি সাহসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর সঙ্গীরা।

এই বিতর্কের শেষে যখন ‘উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলার’র প্রস্তাবটি ভোটে দেয়া হয়েছিল তখন তমিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের সেই সভায় পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ সদস্যদের বিরোধিতার কারণে নাকচ হয়ে গিয়েছিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উত্থাপিত সে প্রস্তাব। কিন্তু পূর্ববঙ্গের সচেতন রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসেবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তার সাথীরা ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে অমর হয়ে থাকার দাবিদার। অথচ আমরা ইতিহাসের এই অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনাকে বিস্মৃতির অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করে ইতিহাস সৃষ্টির মূর্খ চেষ্টায় নিবদ্ধ রয়েছি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন থেকেই পাকিস্তানি সামপ্রদায়িক ও সামন্তবাদী জান্তার নির্মম আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া (বর্তমান কুমিল্লা) জেলার রামরাইল গ্রামে। বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা আদালতের সেরেস্তাদার। শৈশবেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মা মারা যান। ১৯৩২ সালের ৩১ মার্চ তার বাবা মারা যায়।

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারের কাছে। তারপর পাঠশালা ও প্রাইমারী স্কুলে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। এরপর নবীনগর উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঐ বিদ্যালয় থেকে ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঐ বছর তিনি কুমিল্লা কলেজ ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে কুমিল্লা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এফ এ পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় যান। বিএ ভর্তি হন কলকাতার রিপন কলেজে। ১৯০৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ কলকাতার রিপন কলেজ হতে বিএ পরীক্ষায় উত্তির্ন হন। ঐ কলেজ থেকেই ১৯১০ সালে আইন পাস পাশ করে বের হন।

১৯০৬ সালের ৭ ডিসেম্বর সুরবালা দেবী সহধর্মীনি করেন। তাদের সংসারে ১৯১১ সালে জন্ম হয় প্রথম সন্তান আশালতা দত্তের। ১৯১৯ সালে জন্ম হয় পুত্র সঞ্জীব দত্তের। ১৯২৬ সালে জন্ম হয় কনিষ্ঠ পুত্র দীলিপ দত্তের।

১৯১০ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯১১ সালের ১ জানুয়ারী পর্যন্ত তিনি কুমিল্লার বান্দরা উচ্চ ইওংরেজী বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯১১ সালে তিনি আইন পেশায় নিযুক্ত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে বার বার জেলে ও আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। যার ফলে দীর্ঘ দিন এই পেশায় সময় দিতে পারেন নি। এরপর ১৯৩১ সালের নভেম্বর মাসে আবার তিনি আইন পেশাই ফিরে আসেন। আইন পেশাকে ব্যবসা হিসেবে না দেখে সত্যিকারভাবে সেবা হিসেবে দেখেছেন। যার ফলে তিনি গরীব মানুষের মামলা বিনা টাকা পরিচালনা করেছেন। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। সদস্য নির্বাচিত হয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত আইন সংশোধণ এবং বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনী আইন পাশের জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে (ময়মনসিংহ) অংশগ্রহণ করেন। ১৯২১ সালে কুমিল্লায় ‘মুক্তি সংঘ’ নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। ১৯২৩ সালে কুমিল্লায় ‘অভয় আশ্রম’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৯ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি সাময়িকভাবে আইন ব্যবসা ছেড়ে দেন।

১৯৩০ সালের ২ জুলাই আইন অমান্য আন্দোলনের জন্য তাকে ব্রিটিশ সরকার গ্রেপ্তার করে। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৩১ সালের নভেম্বর মাসে আবার তিনি আইন পেশাই ফিরে আসেন। ঐ বছর তিনি কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৩২ সালের ৯ জানুয়ারি বিপ্লবীদের ওপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে আবার ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কারাগারে যেতে হয়। ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কারাগার থেকে মুক্তি পান।

১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা জেলা বোর্ডের (বর্তমান কুমিল্লা জেলা) সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার তিনি সদস্য নির্বাচিত হ্ন। এ সময় তিনি বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনী আইন পাশের সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিলো।

১৯৪০ সালের ১৪ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরোধী প্রচারণা চালানোর অপরাধে আবার তাকে ব্রিটিশ সরকার গ্রেপ্তার করে। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৪৫ সালের জুন মাসে বঙ্গীয় বিধান সভার অধিবেশনে বাজেট আলোচনাকালে ধীরেন্দ্রনাথ কর্তৃক একটি ছাটাই প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাশ হয়। ফলে নাজিমউদ্দিনের মন্ত্রিসভার পতন ঘটে।

১৯৪৬ সালে কংগ্রেস দল থেকে নোমিনেশন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ঐ বছর পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে স্বীকৃতি লাভ করেন।

তিনি ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আইনসভায় সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তখন থেকেই সুত্রপাত হয় ভাষা আন্দোলনের। তিনিই ভাষা আন্দোলনের পটভূমি রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতায় ৪ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর সৃষ্টি হয় ৫২’ র ২১ ফেব্রুয়ারী। ১৯৫২ সালে তিনি সংসদে মহানভাষা আন্দোলনের পক্ষে জোরলো সমর্থন জানান। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্টের বিপুল বিজয়ের কারণে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। ঐ বছর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আবার আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ অনুরোধে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তিনি। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভায় ছিলেন।

১৯৬০ সালে সামরিক শাসনের সময় দেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপরেও ‘এবডো’ আইন প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৪ সালে আইনজীবী এসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ঐ বছর জিন্নাহ’র নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দেয়ার জন্য দায়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখে। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে তিনি লড়াকু সৈনিকের ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। গভীর রাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশব্যাপী গণহত্যা চালায়। সকল মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। কারো বুঝতে অসুবিধে হল না যে, পাকিস্তানীরা বাঙালিকে কোনো অধিকার দিবে না, বরং আন্দোলন –সংগ্রামকারীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ওরা হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে। শুরু হলো প্রতিরোধের পালা।

তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে দেশত্যাগ করে ভারতে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল পরামর্শ দেয়। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। দেশ মাতৃকাকে ছেড়ে যাবেন, এ কথা সবাইকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন। ভাবতে শুরু করলেন দেশে এই সংকটময় মুহূর্তে কি করা যায়, এ সব কথা। কয়েক জনের সাথে আলাপও করেছিলেন।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তানি নরপশু হানাদার বাহিনী ৮৬ বছর বয়স্ক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ছোট ছেলে দিলিপ দত্তকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে ময়নামতি সেনানিবাসে যায়। শুরু করে নির্মম অত্যাচার, হাত-পা ভেঙে দেয়, চক্ষুদ্বয় উৎপাটন করে। ১৯৭১ সালের নববর্ষের দিন ১৪ এপ্রিল তাকে হত্যা করে পাকিস্তানি জানোয়ার বাহিনী।
লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত