আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:৪৭

কোটা কি এমনই খারাপ যে, তা থাকতে নেই? অথবা সংস্কার করা যাবেই না? তবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও অগ্রসরমানতার জন্য প্রচলিত কোটার পাশাপাশি অন্যান্য পদ্ধতির অনুসন্ধান সচল রাখা প্রয়োজন। কেননা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বিষয়টিকে এড়ানোর সুযোগ যেমন নেই, তেমনি সময়ের হিসেবে কখনও কখনও ন্যায্যতাপূর্ণ সুযোগের সম্প্রসারণও এক্ষেত্রে জরুরি।

কোটা রাখার না রাখা, কিংবা সংস্কার করা না করার যে বাহাস চলছে, তাতে কিছু মৌলিক বিষয় এড়িয়ে চলা সহজ হলেও, শেষ বিচারে দেশের জন্য ভালো কিছু হবে না। এক্ষেত্রে কোনো একটিতেই সুনির্দিষ্ট অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই- যৌক্তিক স্লোগান। কিন্তু বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের তাগিদ আমরা অনুভব করিনি। প্রতিদিনই গ্রাম-শহরের বৈষম্য বেড়েছে- সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি সত্বেও। গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ মানবিক প্রয়োজনগুলো প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনে যারা কাজ করছেন অর্থাৎ সেবাপ্রদানকারী হিসেবে আমরা যাদের চিনি, তাদের প্রতিশ্রুতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাবেই মানসম্মত শিক্ষকের সঙ্কট তৈরি হয়েছে, ডাক্তার তার কর্মস্থলের চাইতে শহর-রাজধানীতেই বেশি প্রাণ খুঁজে পান, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ জাতিগঠনমূলক ও পরিষেবাখাতে রাষ্ট্রের প্রাধান্য গ্রামের চাইতে শহরের প্রতি বেশি। এ থেকে গ্রাম-শহরের বৈষম্যের প্রকটতা অনুমেয়।

জাগতিক সবকিছুই যখন অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত তখন গ্রামগুলো দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। অবশ্য তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আমরা বলতেই পারি- দেশে কোনো গ্রাম নেই! বিদ্যুত আছে, রাস্তা আছে মানে সবই এখন শহর হয়ে উঠেছে! খুব ছোট্ট একটি বিষয়, আগে দেখেছি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ছেলে মেয়ে তার কর্ম এলকার বিদ্যালয়ে পড়েছে, এতেই সেখানকার লেখাপড়ার মান ভালো হয়ে উঠেছে, জবাবদিহিতা ছিলো, আর এখন তা নেই। সরকারি চাকুরি কিংবা একটু স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়ে শহরের স্কুলে পড়ে। বিকাশের প্রথম ধাপের এই প্রবণতা গ্রামের প্রতি দায়বদ্ধতাহীন মানুষ তৈরির প্রথম পদক্ষেপ।

আমরা সবাই এখন সরকারি চাকুরি চাই, কেননা সামাজিক বিচারে এই জাতির প্রাণী অনেক সম্মানীত এবং এখানে ক্ষমতা আছে-আছে অথর্বকালীন নির্ভরতা এবং যত বড় পদ-পদবী তত বেশি সুবিধায় আমাদের চাকুরিতে প্রথম পছন্দ কাস্টমস, তারপর প্রশাসন এবং পুলিশ। আমরা শিক্ষক হতে চাই না। হতে চাই না রাজনৈতিক প্রতিনিধি কিংবা কর্মী। কিন্তু চাকুরি নিয়ে ক্ষমতা আর পদোন্নতির জন্য ক্ষমতাসীন দলের দাসে পরিণত হতে আমাদের বাধে না। এমনকি রাতারাতি খোলস পাল্টাতেও পারি। যে কারণে বিএনপির ক্ষমতায় থাকতে স্বাচিপ হয় ড্যাব আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ড্যাব হয় স্বাচিপ! আবার প্রজাতন্ত্রে বঞ্চিত কর্মকর্তা পারিবারিক কিংবা আদর্শিক কারণে ভিন্ন মতাবলম্বী হলেও এমনকি ভোট প্রদানে তার ব্যক্তিগত পছন্দ ভিন্ন হওয়া সত্বেও ক্ষমতাসীনের দাস বনে যান-প্রাপ্তির জন্য। ব্যস্ততা শুধু আমি আর আমার কেন্দ্রিক। সামষ্টিকতায় বিশ্বাস পাই না। গ্রাম-শহর আলাদা থাকে আমার মনোজগতে!

গ্রাম-শহরের বৈষম্যের বিষয়টি কতটা বড়, তা খালি চোখেই দেখা যায়। আনুষ্ঠানিক তথ্য-উপাত্ত না থাকলেও আপাত পর্যবেক্ষণে এটা পরিস্কার যে, বর্তমানে গ্রাম থেকে খুব বেশি সংখ্যক ছেলে-মেয়ে বিসিএস-এ আসতে পারেন না! কারণ দারিদ্র্য আর মানবিক প্রয়োজন পূরণ না হওয়া। কিন্তু এ নিয়ে কাজ কোথায়? যে রাজনীতিক এবং আমলার ওপর এর দায় বর্তায় তারা নিজের বাইরে ভাববার সময়তো পাননি; সর্বাগ্রে সংস্কারটি দরকার এখানেই।

আলোচনার বিষয় যেহেতু কোটা বাতিল এবং সংস্কার সেখানে সবার আগে সংস্কার দরকার মেধা বিকাশ প্রক্রিয়ার। কেননা আমরা পুঁথির যে শিক্ষায় মেধাবী হয়ে উঠছি সেখানে মানবীয় মেধার বিকাশ খুব একটা হচ্ছে না। মেধায় শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয় মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও যে আছে। শিক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিকতার সম্মিলিত মেধাবী গড়ে না উঠলে বৈষম্য দূর হবে না; নিজের প্রত্যাশার কতটা অর্জন হলো না সেটুকুই শুধু আলোচনায় থাকবে। গ্রাম-শহরের বৈষম্য তো অনেক দূরেই থেকে যাবে। এখানে রাষ্ট্রকেই পথ দেখাতে হবে সবার আগে।

বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র যদি সিদ্ধান্ত নিতে পারে একটি মানবীয় মেধাসম্পন্ন জাতি গড়ে তুলবে, তাহলে এখন থেকেই শুরু হতে পারে। এ জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে কোটা সংস্কার বা বাতিলের আগে যে কাজগুলো করা যেতে পারে-

১) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ সকল নিয়োগ একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় থাকবে। সকল বিভাগ বা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে পারবে না।
২) রাষ্ট্রায়ত্ব কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে।
৩) সরকারি-বেসরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বয়সাধন করতে হবে। বেতন-ভাতার বৈষম্য থাকবে না, যাতে শেষ বিচারে সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োজিতদের ব্যবধান না থাকে। এমনকি কোটা বিন্যাস থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একই নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
৪) যোগদানের বয়সসীমা বৃদ্ধি অবসরের বয়সসীমা কমাতে হবে। 
৫) সকল প্রকার নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ।
৬) শিক্ষাখাতে ব্যয় বাড়ানোসহ গ্রাম ও শহরের শিক্ষা সুযোগের বৈষম্য দূর করতে হবে।
৭) মেধার মানবীয় বিকাশের চর্চা করতে হবে, যাতে শিক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক মেধার সমান বিকাশ ঘটে।
৮) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং পদোন্নতির রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে।
৯) পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবহেলা-দুর্নীতির প্রশ্নে তাৎক্ষণিক চাকুরীচ্যূতির বিধান করতে হবে।
১০) মেধার মূল্যায়নে শূন্য কোটাপূরণের ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে।
১১) ননক্যাডার নিয়োগক্ষেত্রে যে আর্থিক বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।

যে কোনো আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি থাকবেই তা কম বা বেশি যাই হোকনা কেন। এ জন্য আন্দোলন মোকাবেলায় যৌক্তিকতার চর্চা জরুরি, যেখানে নীতিগত ব্যাখ্যার পর্যাপ্ততা থাকবে। ব্যানার দেখে একটি আন্দোলনকে সমর্থন দেওয়া আবার সমর্থন প্রত্যাহার করার পর আন্দোলনকারীদের আক্রমণ করার বিদ্যমান রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব দূর করতে হবে। আলোচনাকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে, আলোচনায় যখন সব সম্ভব, তখন যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষাপটে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের মনোভাব ভয়ঙ্কর প্রবণতা। ভুলে গেলে চলবে না, ভঙ্গুর রাজনৈতিক চর্চায় যে কোনো আন্দোলন থেকে সুবিধাভোগীরা সুবিধা নিতেই পারে, এ জন্য ঢালাওভাবে সকলকে হেয়প্রতিপন্ন করা যৌক্তিক সমাধান নয়- এ সত্যটা অনুধাবনে আমরা এবারও ব্যর্থ!

জীবনানন্দ জয়ন্ত
লেখক/আইনজীবী
সংগঠক- গণজাগরণ মঞ্চ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত