নারীর সম্মতির কোন মূল্য নাই

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৮, ১৬:১৬

(১) 

মুল কথাটা হচ্ছে নারীর সম্মতির কোন মূল্য নাই। নারীরও যে ইচ্ছা থাকতে পারে এই কথাটাকে আমরা মূল্য দেই না। কেন দেই না? এমনিই? না। এইটাই হচ্ছে পুরুষবাদ, এইটাই হচ্ছে পুরুষের রাজনীতি, এইটাই হচ্ছে পুরুষের দর্শন, এইটাই হচ্ছে পুরুষের সমাজবিজ্ঞান পুরুষের কেমিস্ট্রি ফিজিক্স। 'নারীর ইচ্ছা' কথাটা পুরুষের কাছে একটা অর্থহীন কথা। নারীর আবার ইচ্ছা কি? আমি যে বাড়ীতে গরু রাখি, গরুর আবার ইচ্ছা কি? বিড়াল পুষি যে, বিড়ালের আবার ইচ্ছা কি? মুরগির আবার ইচ্ছা কি? অথবা ফুলগাছটার বা আমগাছটার? অথবা আমার ঘোড়াটার বা গাড়ীটার? এদের যদি কোন আলাদা ইচ্ছা না থাকে তাইলে নারীরই আবার ইচ্ছা থাকবে কেন?

গতকাল রাতে সীতাকুণ্ডে দুজন ত্রিপুরা কিশোরীর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বেশ কয়েকজনকে দেখলাম ফেসবুকে ওদের ফটো পোস্ট করেছে। পাশাপাশি দুইটা ফুটফুটে মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। দুজনের মুখেই কিশোরীর সেই হাসিটা ঝুলে আছে। সস্তা সিনথেটিক কাপড়ের উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরেছে দুজনেই। চৌদ্দ পনের কি ষোল বছর বয়স একেকজনের। একটি মেয়ের ঠোটে ঐরকম একটা দুষ্টু হাসি- ঐ যে টিনএজারদের থাকে না? যখন ওরা মনে মনে একটা দুষ্টুমি ফাঁদে আর ভাবে যে পৃথিবীর কেউ সেটা টের পাচ্ছে না, সেইরকম। দেখে আপনার মনে হবে যে মেয়েটা জেগে আছে, দুষ্টুমি করে ঘুমের ভান করছে।

একজন আমাকে বললেন যে এটা নাকি ওদের মৃতদেহের ছবি। কী যেন হৃৎপিণ্ডটা চেপে ধরে- এই ফুটফুটে মেয়ে দুইটাকে কে মেরেছে? পৃথিবীতে কত মন্দলোক কত চোর গুণ্ডা শয়তান বেঁচে থাকে কতো কতো বছর ধরে। এই দুইটা ফুল, ওদের চেহারার দিকে তাকালে মনটা আর স্থির থাকে না, কার এমন কি ক্ষতি হতো ওরা যদি আরও কয়েকটা বছর বাঁচত এই পৃথিবীতে? ত্রিপুরা আদিবাসী মেয়ে, ওরা তো আর আপনার ধনসম্পদ সুখ আরাম কেড়ে নিত না! এই বিশাল দেশের কোন এক কোনায় আধপেটা একবেলা দুইবেলা খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকতো এই দুইটা প্রাণ।

জীবন কতো চমৎকার হতে পারে সুন্দর হতে পারে সেকথা ওরা কি জেনেছে কোনদিন? কোনদিন পূর্ণিমায় কি ওরা একে অপরে হাত ধরে চাঁদের দিকে তাকিয়েছিল? কোনদিন সমুদ্রের দিকে কি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে কি ওদের মুখ হা হয়েছিল? জানিনা। কিন্তু পৃথিবী যে কতো কুৎসিত কদাকার আর নির্দয় আর নিষ্ঠুর হতে পারে সেটা ওরা টের পেয়ে তারপরই মরেছে। যতটুকু জেনেছি, এই দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করে তারপর হত্যা করে ঝুলিয়ে দিয়েছে দড়িতে।

(২) 
নারীরই সম্মতির দরকার নাই, কেননা নারীর তো ইচ্ছা থাকতে হয় না। নারী হচ্ছে ভোগ্য- খোলা থাকলে মাছি বসে খেয়ে ফেলবে। ভোগ্যের আবার ইচ্ছা কি আর অনিচ্ছা কি। ইচ্ছা থাকবে ভোক্তার। পুরুষ হচ্ছে ভোক্তা। পুরুষের থাকবে ইচ্ছা পুরুষের থাকবে পছন্দ। পছন্দ মতো পণ্য কিনবে পুরুষ আর তাকে ইচ্ছা মতো ভোগ করবে। কখনো কখনো আবার চুরি করবে, সেখানেও ঐ একই কথা- মুরগি চুরি করতে গেলে মুরগির মালিক যদি বাধা দেয় সেটা না হয় সহ্য করা যায়। কিন্তু মুরগি যদি বেশী কককক করতে থাকে, তাইলে কি করবেন?

কেনা পণ্যের যে সম্মতি বা ইচ্ছা বলতে কিছু থাকতে নেই সেই নিয়ে একটা ঘটনা বলি। আপনারা হয়তো জেনেছেন ইতিমধ্যে, সাম্প্রতিক ঘটনা। সুদানের ১৯ বছর বয়সী কিশোরী নুরা হুসেন (Noura Hussein) এর গল্প।

নুরা হুসেনের বয়স যখন ১৫ কি ১৬ তখন ওর বাবা ওকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে জোর করে। বরের নামটা ভুলে গেলাম, হুম্মাম নাকি হাম্মাম কি যেন একটা নাম। কয়েকবছর নুরা ছিল বাপের বাড়িতেই, গতবছর ওরা ওকে তুলে নিয়ে গেছে শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুরবাড়িতে ওর বর ওর উপর উপগত হবেন, হানিমুন বলে কথা, কিন্তু নুরা চাইছে না। পুরুষ স্বামী সেকথা মানবেন কেন? তিনি তো নুরার মালিক, নুরা হচ্ছে ওর সম্পদ, সে তো যখন ইচ্ছা তখন নুরাতে গমন করতে পারে, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে। নুরার আবার ইচ্ছা কি অনিচ্ছা কি বা মতামত কি? একদিন দুদিন এইভাবে যাওয়ার নুরার বরের আর সহ্য হয়নি।

এতো বড় বেয়াদবি? হাম্মাম মিয়া ওর ভাইদের ডেকেছে বাসর ঘরে, একজন আপন ভাই আর তিনটা চাচাতো ভাই। চার বীরপুরুষ ভাই নুরাকে চেপে ধরেছে নিচে আর আরেক বীরপুরুষ, নুরার মালিক, তিনি নুরাকে ধর্ষণ করেছেন ইচ্ছামতো। না, ওরা এটাকে ধর্ষণ মানে না। আমাদের এখানেও লোকজন এটা মানবে না। স্ত্রীর ইচ্ছা নাই তাতে কি? স্বামী যদি স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধেও করে সেটা নাকি ধর্ষণ না। যাই হোক, জোর করে সেদিন করেছে। নুরার প্রতিরোধ টিকে নাই।

(৩) 
এর কয়েকদিন পর বীরপুরুষ আবার এসেছে নুরার উপর উপগত হবে। নুরা আবার বাধা দিয়েছে, বীরপুরুষ বাধা মানবে কেন? নুরা এইবার ওকে একদম ছুরি মেরে দিয়েছে। বীরপুরুষের সেইখানেই মৃত্যু হয়েছে।

নুরা ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচার জন্যে হত্যা করেছে- নৈতিকভাবে নুরা কোন অপরাধ করেনি। সুদানের শরিয়া আদালত নুরার আত্মরক্ষা বা self-defenceএর আবেদন অগ্রাহ্য করে নুরাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। শরিয়া আদালত যেহেতু, সেখানে মৃতের আত্মীয়রা ক্ষমা করলে আদালতের সুযোগ ছিল নুরাকে মুক্তি দেওয়ার। আদালত বীরপুরুষের পরিবারের সদস্যদেরকে জিজ্ঞাসা করেছে, বলেছে যে দেখেন, ছোট মেয়ে, নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে মেরে ফেলেছে, কি হবে ওকে ফাঁসি দিয়ে, মাফ করে দেন। পরিবারের সদস্যরা মাফ করেনি, ওরা ফাঁসি চায়। আদালত নুরাকে ফাঁসি দিয়েছে।

নুরার উকিলরা আপীল করেছে উচ্চ আদালতে, নুরা এখন জেলে আছে। কিন্তু সুদনাএর যা আইন, আর শরিয়ার যা বিধান তাতে আদালত থেকে নুরার মুক্তি কোন সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। একমাত্র উপায় হচ্ছে সুদানের সরকার যদি ওর সাজা মওকুফ করে দেয়। www.change.org থেকে ওরা ক্যাম্পেইন করছে সারা দুনিয়ায়, সুদানের সরকারের কাছে অনুরোধ জানাতে, যদি নুরার প্রাণ বাঁচানো যায়। আপনারাও এই সাইটটাতে গিয়ে দেখতে পারেন, কিছু যদি করতে পারেন।

সম্প্রতি একজন এক্টিভিস্ট দেখা করেছেন নুরার সাথে খারতুম থেকে দুরে অমদুরমান নামে একটা কারাগারে। দেখা করে এসে তিনি সিএনএনএর সাথে বলেছেন যে নুরার মনোবল শক্ত আছে। সাক্ষাতের সময় নুরার পরনে ছিল একটা লম্বা ড্রেস আর হাতে পায়ে শিকল। ওকে সমর্থন করছে এমন একজনের দেখা পেয়ে কাঁদছিল মেয়েটা। বাইরের দুনিয়ায় ওর হয়ে লোকজন কথা বলছে, ওকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে সেকথা জেনে ভালো লেগেছে ওর।

(৪)
এই দুই ঘটনায়ই, দুইটা ত্রিপুরা আদিবাসী মেয়েকে যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো আর নুরাকে যে ফাঁসি দেওয়া হলো, এই দুইটা ঘটনার মিলটা কোথায়? মিল হচ্ছে দুই ক্ষেত্রেই নারীর ইচ্ছা বা নারীর সম্মতিকে অস্বীকার করা। ধর্ষণের ক্ষেত্রে যে নারীর সম্মতিকে অস্বীকার করা হচ্ছে সে তো ব্যাখ্যা করার কিছু নাই। কিন্তু নুরার ক্ষেত্রে? নুরার ক্ষেত্রে একটি দেশের আইন, সেদেশের আদালত তথা সেদেশের সংস্কৃতি রাজনীতি নৈতিকতা সবকিছুই বলছে নুরার সম্মতির কোন দাম নাই। যেহেতু নুরার বিবাহ হয়েছে সেই বীরপুরুষের সাথে, নুরা হয়ে গেছে ওর স্বামী সাহেবের সম্পত্তি। সম্পত্তির আবার সম্মতি কি?

আমাদের এইখানেও কিন্তু একই অবস্থা। আমাদের এখানেও প্রকৃতপক্ষে নারীর সম্মতির কোন দাম নাই। নিজের স্ত্রীর সাথে জোর করে করলে আমাদের আইনেও সেটাকে ধর্ষণ বিবেচনা করা হয়না। কেন? কারণ সঙ্গমটা আমদের এখানে দুইজনের মিলন হিসাবে দেখা হয়না। এটা হচ্ছে পুরুষের ভোগ, পুরুষের বিনোদন, পুরুষের প্রয়োজন। এই ভোগের জন্যে পুরুষ বিবাহ করেছে, তার মানে হচ্ছে পুরুষ ওর মালিক হয়ে গেছে। এরপর স্বামীটি স্ত্রীর সাথে কখন করবে কিভাবে করবে এই সবই হচ্ছে ওর ইচ্ছা। বিবাহ মানেই নাকি এইরকম স্ট্যান্ডিং সম্মতি।

বিবাহিত স্ত্রীকে করলে যে ধর্ষণ হতে পারে সে তো আমাদের কল্পনার বাইরে। এমনকি স্ত্রী ছাড়া অন্য নারীর সাথেও যদি একজন পুরুষ জোর করে বুনা সম্মতিতে করে, সেখানেও দেখবেন যে পুরুষরা নানারকম ইয়ে খুজবে। 'মেয়েটার কি আগে সঙ্গমের অভিজ্ঞতা ছিল? ও, না সে তো বিবাহিতা না কিন্তু ভার্জিনও না' বা 'ও, সে তো এর আগেও কয়েকজনের সাথে করেছে' বা 'ও, সে তো আমার বন্ধুর সাথে শুয়েছে, তাইলে আমি করলে অসুবিধা কি?' বা 'দেখেন, তো, মেয়েটার তো ভাই ক্যারেক্টার ভালো ছিল না, অতো রাতে গেহচে কেন পার্টিতে'- এইরকম কতো কথা।

এইগুলি কথা কেন বলে পুরুষরা? কারণ পুরুষের কাছে নারীর সম্মতির কোন গুরুত্ব নাই। ধর্ষণের মধ্যে নারীর সম্মতির অনুপস্থিতি পুরুষের কাছে কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না। ধর্ষণকে পুরুষ একটি অপরাধ বিবেচনা করে কারণ ধর্ষণ হচ্ছে অপরের মাল চুরি করে খেয়ে ফেলা। ধর্ষণকে পুরুষ নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করে না, এটি হচ্ছে সেই নারীটির মালিকের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। যেন পড়শির ছাগল চুরি করে খাওয়া। কোনওরকমে যদি আপনি দেখাতে পারেন যে এই ছাগলটি পরিত্যাক্ত ছিল বা এটিকে আগেই কেউ খেয়ে দিয়েছে তাইলে পুরুষের দৃষ্টিতে সেখানে আর কোন অপরাধ নাই।

(৫) 
পুরুষের দৃষ্টিতে ধর্ষণ হচ্ছে নারীকে নষ্ট করা। অনেকটা অপরের খাবারের মধ্যে যেন আপনি ময়লা হাত ঢুকিয়ে দিলেন আরকি। ঐ যে সিনেমায় দেখেন না, ধর্ষণের শিকার মেয়েটা বলছে, আমাকে ওরা অপবিত্র করে দিয়েছে, আমি আর তোমার লায়েক নাই। সেরকম। ধর্ষণ মানে যেন মেয়েটাকে নষ্ট করা। কোন অবিবাহিতা মেয়ে যদি ভার্জিন না থাকে, তাইলে তো সে ইতিমধ্যে নষ্ট হয়েই গেছে, তাকে আর নষ্ট করার কি আছে। নারীর সম্মতি! ঐটার আবার কোন দাম আছে নাকি!

এখন আমার কোন ভাইজান বলবেন যে না, সব পুরুষ কি এক? পুরুষদের মধ্যেও তো ভালো খারাপ আছে। এইটা নিয়ে আলাদা করে বরং আরেকটা পোস্ট লিখি। এখানে শুধু এইটুকু বলে রাখি, এইটা আসলে ভালো মন্দের বিষয় না। এইটা রাজনীতি- নীতিগত অবস্থানের ব্যাপার। আপনি হয় নারীকে পুর্নাঙ্গ মানুষ বিবেচনা করবেন অথবা না। এর মাঝামাঝি কিছু নাই। আপনি এমনিতে মোটা দাগে ভালো মানুষ হতে পারেন, আবার পুরুষবাদীও হতে পারেন। ভেবে দেখেন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত