টরন্টোতে এই সেই দালান যার ওপরে ১৩ বছর লাগানো ছিল ‘দারুল কাদা’ অর্থাৎ ‘ন্যায়বিচারের বাড়ি’, পুরো পশ্চিমা বিশ্বে সর্বপ্রথম দেশের আইন সমর্থিত শারিয়া কোর্টের গর্বিত সাইনবোর্ড। ইসলামের লেবেল লাগানো সে অনৈসলামিক সাইনবোর্ড চিরতরে কবর দিয়েছি - কিভাবে দিয়েছি?

শারিয়া-ক্যানাডার মুক্তিযুদ্ধ!!

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৮, ১২:১৩

১১ সেপ্টেম্বর রবিবার, ৩৫ মুক্তিসন (২০০৫)। আমার দুর্ঘটনাবহুল জীবনে অবিস্মরণীয় একটা শুভদিন। এমনই আর একটা দিন এসেছিল, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। বহু বছর আগে পরে ওই আর এই, এই দু’টো দিনে শির নেহারি আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর। বহু বছরের এপারে ওপারে দাঁড়ানো সেই ধূর্ত নিষ্ঠুর প্রবল প্রতিপক্ষ যারা আল্লার নামে মানুষ খুন করেছে। আমার ধর্মকে বদনাম করেছে। আর তার বিষাক্ত চোখে রক্তচোখ রেখে বলদৃপ্ত দাঁড়ানো ক্ষতবিক্ষত শান্তিকপোত এই আমি।

কিছুই জানতাম না কেউ। জানত না লখীন্দরের লোহার বাসরের গোপন ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়েছে কালনাগ, ক্যানাডার ধর্ম-নিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ‘‘মাল্টি-কালচার’’ নীতির সুযোগে ঢুকে পড়েছে ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র। ক্যানাডার সবচেয়ে জনবহুল ও সমৃদ্ধ প্রদেশ অন্টারিও, তার সবচেয়ে জনবহুল ও সমৃদ্ধ শহর টরন্টেতে প্রতিদিন শত শত ইমিগ্র্যান্ট আসছে, মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। রায় দিতে কোর্ট-কাচারীর দেরী হচ্ছে, টাকা-পয়সার টানাটানি তো আছেই। তাই অন্টারিও’র প্রাদেশিক সরকার ১৯৯১ সালে আইন বানিয়েছে, সম্প্রদায়গুলো তাদের নিজস্ব বিধি-বিধান দিয়ে পারিবারিক সমস্যার মীমাংসা করতে পারবে।

২০০৩ সালে কিছু উকিল আর মওলানা বেড়াতে গেলেন নূর মসজিদে, পালের গোদা ব্যারিষ্টার মুমতাজ আলি। গিয়ে দেখলেন ইমাম সাহেব কিছু পরিবারের তালাক-ঝগড়া ইত্যাদির মীমাংসা করার চেষ্টা করছেন। কথায় বলে, স্বর্ণকার আর উকিল নাকি নিজের মা’কেও ছাড়ে না। পালের গোদা ব্যারিষ্টারের মুখ ফস্কে অবধারিত বের হয়ে গেল - ‘‘মাই গড ! এ থেকে তোমরা তো অনেক মালপানি বানাতে পারবে হে !’’ হা হয়ে গেল ইমাম সাহেবের মুখ, তাঁরা জানেন ইসলামি সমাজসেবায় টাকাপয়সা নিতে কোরাণে মানা আছে। তাঁরা এ-ও জানেন কোনকালে শারিয়া কোর্টে কোন ফিস ছিলনা, কোর্ট ছিল জনগণের জন্য ফ্রী। নূর মসজিদও ফ্রী।

কিন্তু ডলারের প্রেম বড় প্রেম। তাই মুমতাজ আলিরা আবিষ্কার করলেন এক্ষুনি শারিয়া কোর্ট না বানালে মুসলমানই থাকা যাচ্ছে না। তাই তড়িঘড়ি করে বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে কিচ্ছু না জানিয়ে কিছু পছন্দসই লোককে নিয়ে ১৯৯১ সালের আইনের সুযোগ নিয়ে বানালেন ইসলামি কোর্ট দারুল কাদা (দার মানে বাড়ী, কাদা মানে ন্যায়বিচার)। কি বিচার চলল তা কেউ জানল না। ১৪ বছর পর ২০০৩ সালে তাঁরা সরকারের কাছে আবেদন করলেন ‘‘আর্বিট্রেশন’’-এর অধিকার পাবার জন্য। এতদিন তার রায়ের বিরুদ্ধে ক্যানাডিয়ান কোর্টে আপীল করা যেত। এখন ‘‘আর্বিট্রেশন’’-এর অধিকার পেলে এ কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ক্যানাডিয়ান কোর্টে আপীল করা যাবে না। অর্থাৎ তাঁরা একই দেশে স্বায়ত্বশাসিত একটা সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা চালাতে চান। কাদার খবরটা ফাঁস হয়ে সবগুলো খবরের কাগজে প্রচন্ড শব্দে হাটে হাঁড়ী ভাঙ্গল, - চমকে তাকাল ক্যানাডা, চমকে তাকালাম আমি। ক্যানাডায় শারিয়া কোর্ট? বলে কি?? আমি শারিয়ার বিরুদ্ধে আমার ইসলামি মুক্তিযুদ্ধ করি আর শারিয়া আইন এসে খুঁটি গেড়েছে আমারই শহরে??

কোনমতে অফিসটা করলাম শুধু, আর কিছু করলাম না এই শারিয়া কোর্টের টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা ছাড়া। বাগালাম ওদের গোপন ব্রসিয়র-টা কোনমতে, কোরাণ-রসুলের প্রতি অতিভক্তি একেবারে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে সেটাতে। একাত্তরের সেই কসাইয়ের জীঘাংসাময় শঠ মুখের প্রতিচ্ছবি সুস্পষ্ট সে ব্রসিয়রে। এ দানবের চেহারা জানে না মানুষ, কিন্তু আমি তো একাত্তরের সন্তান, আমি তো জানি। আমার ধর্মের নামে যে আমার মা’কে প্রহার করা বৈধ করে, আমার বোনকে হিলা বিয়ের অজুহাতে পরপুরুষ দিয়ে ধর্ষণ করায় তার গালে বিশ্ব কাঁপানো শব্দে আমার পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ না তুলে মরব না তো আমি।

ততদিনে টরেন্টোতে হুলুস্থুল বেধে গেছে। শারিয়ার বিরুদ্ধে (১) মুসলিম ক্যানাডিয়ান কংগ্রেস, (২) ক্যানাডিয়ান কাউন্সিল অফ মুসলিম উইমেন আর (৩) ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন এগেইনষ্ট শারিয়া কোর্ট ইন ক্যানাডা, - এই ত্রিমূর্তির আঘাত দিনে দিনে হয়ে উঠল দুর্বার। তিনটাই মুসলমানের নাম, প্রথমটার তারেক ফাতাহ্‌, দ্বিতিয়টার আলিয়া হগবেন আর তৃতিয়টার হোমা আর্জুমান্দ। তিন দিক থেকে শুরু করলেন আক্রমণ, - সরকারের টনক নড়ল। কি ব্যাপার? শারিয়া কোর্ট চালু হলে মুসলমানদের তো খুশী হবার কথা, তা না হয়ে ওরা প্রতিবাদ করছে কেন?

মোল্লারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কিন্তু শারিয়ার আইনগুলো কস্মিনকালেও দেখায় না। তাই শারিয়ার আইন উদ্ধৃতি দিয়ে টাইপ করলাম এক পৃষ্ঠার অগ্নিবাণ। তার এক হাজার কপি বানিয়ে আমি, ডঃ হাশমি আর হুসেন গরমের দুপুরে স্রেফ পায়ে হেঁটে ছড়িয়ে দিলাম শহরের কেন্দ্রে ক্যানাডিয়ানদের হাতে হাতে। অনতিবিলম্বে সেটা পৌঁছে গেল মোল্লাদের হাতেও। শারিয়া আইনের নিষ্ঠুরতা উদ্ধৃতি দেখে ক্যানাডিয়ানরা ভির্মি খেল, মোল্লারা নগ্ন হবার সম্ভাবনায় ক্ষিপ্ত হল, হুমকি দিয়ে ইমেইল পাঠাল। আর এল MCC মুসলিম ক্যানাডিয়ান কংগ্রেস-এর আমন্ত্রন। যোগ দিলাম তার কেন্দ্রীয় কমিটিতে, - ডিরেক্টর, শারিয়া ল’ হিসেবে। আমাদের নেতারা গড়ে তুললেন প্রায় পঞ্চাশটা নারী-সংগঠনের দুর্ভেদ্য জোট - ওয়েবসাইটে শারিয়া-কোর্টের ওপরে করলেন আইনগত নিবন্ধের সংকলন আর নিরলস কাজ করলেন সামাজিক-সাংগঠনিক ফ্রন্টে।

কখনো ভাবিনি লড়তে হবে আরেক একাত্তর ওই একই দানবের বিরুদ্ধে।

আমার প্রধান কাজ হল টেলিভিশনে ইসলামী তত্ত্ব-তথ্যে প্রতিপক্ষকে ক্রমাগত আক্রমণ করা। টেলিভিশনে প্রত্যেক বার প্রতিপক্ষকে আলোচনায় ডাকা হল কিন্তু কেউ এল না। সমর্থনের প্রচুর ই-মেইল আসতে লাগল, ওদিকে আমাদের ইরাণী দল হয়ে উঠল এমন প্রচন্ড এক ঘুর্ণিঝড় যার বর্ণনা ভাষায় সম্ভব নয়। সমস্ত ক্যানাডা তখন অবাক বিস্ময়ে দেখছে এক একটা মেয়ে যেন অগ্নিগিরির এক একটা বিস্ফোরণ, কার সাধ্য তার সামনে দাঁড়ায়। তারাই তো শারিয়া-বিশেষজ্ঞ, ইরাণে শারিয়ার আগুনে পুড়ে এসেছে তারা। একের পর এক হল কনফারেন্স-সেমিনার, বক্তৃতায় মোল্লাদের বিরুদ্ধে চীৎকার করে চললাম আমরাও - খবরের কাগজের উপায় থাকল না আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে যাবার। ইরাণী দলই ইউরোপে ছড়িয়ে দিল এ প্রতিরোধ, সেখান থেকে বিভিন্ন সামাজিক আর মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবাদ আসতে থাকল সরকারের কাছে। এই প্রথম বিব্রত বোধ করল সরকার, প্রাক্তন অ্যাটর্নী জেনারেল ম্যারিওন বয়েডকে ভার দিলেন খোঁজ-খবর নিয়ে সরকারকে পরামর্শ দিতে।

এই সেই ম্যারিওন বয়েড যিনি ছিলেন ১৯৯১ সালে অন্টারিও-র অ্যাটর্নী জেনারেল, তিনিই প্রস্তাব করে বানিয়েছিলেন ধর্মীয় কোর্টকে বৈধ করার আইন বানাতে। এই অমুসলিম মহিলার হাতেই ঝুলতে থাকল ‘‘আল্লার আইন’’-এর ভবিষ্যৎ, মোল্লারা সেটা মেনেও নিলেন।

আমরা আর মোল্লারা আলাদা ভাবে চতুর্দিক থেকে আঘাত খাওয়া মৌমাছির মত ঝাঁপিয়ে পড়লাম বয়েডের অফিসে। আমি গেলাম বিস্তর কেতাব-পত্র নিয়ে - তাঁকে বোঝাবার প্রাণপন চেষ্টা করলাম। বয়সী মহিলা, গম্ভীর হয়ে সব শুনলেন। মনে হল যেন কাজ হয়েছে। কিন্তু হা হতোস্মি! ডিসেম্বরের খ্রীষ্টমাস ছুটির মধ্যে তাঁর পরামর্শ সরকারের কাছে পেশ করলেন - শারিয়ায় কিছু দুর্বলতা আছে বটে কিন্তু তাঁরা সেগুলো প্রতিরোধের ব্যবস্থা করবেন, কারো ওপর অত্যাচার হবে না। আমাদের মুখ গেল চুপসে, মোল্লা-সমাজে বয়ে গেল আনন্দের বন্যা।

ততদিনে খবরের কাগজগুলো আর রাজনীতিকদের কব্জায় এনে ফেলেছে মোল্লারা। ওদের অনেক সংগঠন, প্রতি জুমায় খোৎবা দেবার সুযোগ, আর আগাধ পয়সা। এখানকার অনেক মসজিদ হয়েছে সৌদি-পয়সায়, নিমকের কাছে বাঁধা তারা। ঘনঘন দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায় রাজনীতিকদের, পুলিশের কর্ণধারদের আর সাংবাদিকদের, আমরা দুরে বসে দেখি আর হাত কামড়াই। আমাদের তো অত পয়সা নেই। দৈনিক টরন্টো ষ্টার-এ সেই পুরোন পচা রেকর্ড বারবার বাজতে থাকল - সেই সাথে মোল্লাদের হৈ চৈ তো আছেই, আমরা একেবারেই কোনঠাসা হয়ে পড়লাম। আমি মোল্লাদেরকে ই-মেইল করে আলোচনার প্রস্তাব দিলাম, মিহিসুরে উত্তর এল - শিগগিরই জানাবে। সে শিগগীর আজও আসেনি। এক আল্‌ আজহারী জামাতি মুবিন শেখকে ধরে টেলিভিশনে আমার সাথে বিতর্কে আনা হল, বিতর্কে তাকে কোনঠাসা করতে পেরে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ওরা কি করে যেন কাগজগুলোকে হাত করে ফেলল, ওদের দাওয়াতের বন্যায় আমাদের রাজনীতিকেরা ঢেকুর তুলে ঝুঁকে পড়তে লাগলেন ওদের দিকে, একসাথে ছবি উঠতে থাকল খবরের কাগজে, -মোল্লা আর মন্ত্রীদের বত্রিশ দাঁতের হাসিমুখ। আমরা হতাশ হয়েও হাল ছাড়লাম না, বছর গেল। এবার এল মাহেন্দ্রক্ষণ। ওদের দাওয়াত খাবার পর বিবৃতি দিলেন স্বয়ং ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রী পল মার্টিন ওদের সমর্থন করে। সাথে সাথে আমরা ছোট্ট তিনটে সংগঠন যেভাবে বিস্ফোরণে ফেটে পড়লাম তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। এবারে চাকা একটু একটু করে উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করল। দৈনিক গ্লোব অ্যান্ড মেইল-কে বলে কয়ে জরীপ চালানো হল তিনদিন ধরে, ৮০০০ ভোটের মধ্যে ৯৪% ক্যানাডিয়ান রায় দিলেন আমাদের পক্ষে, শারিয়া কোর্টের বিপক্ষে। তিনজন বিখ্যাত ক্যানাডিয়ান লেখক বিবৃতি নেয়া হল শারিয়ার বিপক্ষে, - এসব দেশের জনগণ আর সরকারের ওপরে এর প্রবল প্রভাব। ওদিকে ইরাণী দলের নেত্রীত্বে ক্যানাডিয়ান-ইউরোপিয়ান ৮৭টা (৮৭টা !) সংগঠনের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, ভ্যানকুভার, প্যারিস, ডসেলডর্ফ রোম সহ ১২টা জায়গায় ক্যানাডিয়ান পার্লামেন্ট ও দুতাবাসের সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল জনতা। টরন্টো-র পার্লামেন্টের সামনে ক্যানাডিয়ান মহিলারা উচ্চস্বরে ঘোষনা করল - হে প্রধানমন্ত্রী! আমরা মেয়েরা যদি তোমাকে ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠাতে পারি তবে তোমাকে নামিয়েও আনতে পারব।

বুক ধুক ধুক করছে সবার তখন। আমদেরও, মোল্লাদেরও। কি হয়, কি হয়।

তারপর এই রবিবার, ১১ই সেপ্টেম্বর ৩৫ মুক্তিসন (২০০৫) । সারাদিন ছুটোছুটি করে এসে বিকেলে কম্পিউটার খুলে দেখি, শতাব্দীর সুখবর অপেক্ষা করছে ই-মেইলে। বিকেল ৪:২০ মিনিটে অন্টারিও-র প্রধানমন্ত্রী ডালটন ম্যাকগুইন্টি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন, সব মানুষ একই আইনের অধীনে থাকবে, কোন ধর্মীয় কোর্ট চলবে না, ১৯৯১-এর সেই আইন বাতিল করা হবে। জোঁকের মুখে নুন আর হুঁকোর পানি দুই’ই পড়েছে তখন, আকস্মিক আঘাতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মোল্লারা। চারদিক থেকে পাকিস্তান মিসরের রাঘব বোয়ালেরা এসে হাজির হয়েছে, বিনা যুদ্ধে সুচ্যগ্র মেদিনী ছাড়ার পাত্র নয় তারা। ‘‘মুসলমানের চিরশত্রু’’ ঈহুদী-খ্রীষ্টানদের কোর্টের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে সরকারের কাছে তদ্বিরের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। ওদের সেমিনার কনফারেন্স হচ্ছে প্রতিদিন, সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে তারা। এই প্রথম পশ্চিমের আইনে শারিয়া কোর্টের বৈধতার সুযোগ এসেছে, মরণকামড় দেবেই তারা যতদিক দিয়ে সম্ভব। তবে আমরাও জেগে আছি সতর্ক, আমিও তাই চাই, ওরা কোর্টে গেলে আমরাও কোর্টে বিশ্বের সামনে প্রমাণ করতে পারব বিশ্ব-মানবতার জন্য শারিয়া আইন কি হুমকি এবং কেন শারিয়া আইন ইসলাম বিরোধী।

ক্যানাডার কেন্দ্রীয় সংসদে আমন্ত্রিত হয়ে আমরা সাংসদদের বোঝাতে পেরেছি যে বাইরে থেকে বোঝা না যেতে পারে কিন্তু শারিয়া কোর্টকে পশ্চিমের কোন দেশের আইন বৈধতা দিলে তার প্রভাব অত্যন্ত সুদুর প্রসারী। ক্যানাডার অন্যান্য প্রদেশে মোল্লারা তৈরী হয়ে একেবারে মুখিয়ে ছিল, শারিয়া এ বৈধতা পেলে সাথে সাথে তারা নিজেদের সরকারের ওপরে প্রচণ্ড চাপ দিত সেখানেও শারিয়া কোর্টের বৈধতার জন্য। একই পথ ধরত ইউরোপের মোল্লারাও, ক্যানাডার উদাহরণ তাদের শক্তশালী অস্ত্র হত। সাদারা তো জানে না শারিয়া আসলে আইন নয়, ওটা আসলে বিশ্ব-ইসলামী রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রময় দুঃস্বপ্ন। যে লোক শারিয়ায় বিশ্বাসী সে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-সংগ্রাম করতে বাধ্য। নূরাণী চেহারায় অতি বিনয়ী অভিনয়ে কোথাও না কোথাও তারা সফল হতই, একবার সফল হলে এ আগাছাকে ওপড়ানো অসম্ভব কঠিন হত। সবচেয়ে সর্বনাশা প্রভাব পড়ত মরক্কো থেকে বাংলাদেশ হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্য্যন্ত সব মুসলিম দেশগুলোতে যেখানে ক্রমবর্ধমান মোল্লাতন্ত্রের চাপে প্রগতিশীল শক্তি এমনিতেই ক্ষয়ীষ্ণু। ওসব দেশে মোল্লারা প্রচার করত পশ্চিমের চেয়ে শারিয়া নিশ্চয়ই অনেক ভাল - না হলে কি আর ক্যানাডার মত দেশ শারিয়াকে বৈধ করেছে? এ যুক্তির সামনে প্রগতিশীল শক্তির কিছু বলার ছিলনা, এ তামস কাটতে সময় নিত কে জানে কত শতাব্দী। সেদিক দিয়ে আমরা এক মহা বিপদ থেকে বেঁচে গেছি, বেঁচে গেছে বিশ্ব-মানবতা।

প্রথম খবরটার সত্যতা টেলিফোনে ঝালাই করে নিলাম। বহু বছর পর এইপ্রথম আমার শরীর অবিশ্বাস্য ক্লান্তিতে আর তৃপ্তিতে ভেঙ্গে পড়ল। ইসলামের ছদ্মবেশী এই দানবকে আঘাত করার জন্য কতদিন হল ঠিকমত ঘুমাই নি, বিশ্রাম নিই নি। বিশ্ব-মানবের ঘোর শত্রু ইসলামের ছদ্মবেশী এ কালনাগের মাথায় পা’ রেখে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছিলাম একাত্তরে জন্মভুমিকে মুক্ত করে। আজ আবার দাঁড়ালাম আমার নুতন দেশ ক্যানাডাকে মুক্ত করে। আজ আমার বিদ্রোহী রণক্লান্ত হবার অধিকার আছে। তারেক আর হোমাকে ফোন করে দেখি ওদের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। দীর্ঘ দু’টো বছর ধরে উন্মত্ত মহিষের মত যে প্রচন্ড লোকটা আর রণচন্ডী যে মেয়েটা ক্যানাডা-ইউরোপ কাঁপিয়ে দিয়েছে ক্লান্তিহীন তারা আজ চিঁ চিঁ করছে, ক্লান্তিতে কথাই বলতে পারছে না। আমি জানি, - ওদের ক্লান্তির কারণ হল তৃপ্তি, - মহা তৃপ্তি। এ তৃপ্তি সকলের ভাগ্যে হয়না।

এ অন্ধকার চিরদিন থাকবে না। শতাব্দী- লাঞ্চিতা অগণিত মা-বোনের অশ্রু আর দীর্ঘশ্বাসের অভিশাপের দেনা শোধ করতে হবেই শারিয়াকে। নিজেরই মহাপাপের ভারে সে একদিন খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়বে। সে বিবর্তনে বিশ্বের বিবেকবান মানুষরা চেষ্টা করতে থাকুক, আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্যে চেষ্টা আমি করেছি প্রাণপণ। আমার বই রইল, মুভি রইল । ওগুলো দেখবে সাধারণ মানুষ, - দেখে জানবে শারিয়া কি ভয়ংকর। জানলে তাদের আগ্রহ বাড়বে, তারা খুঁজে বের করবে রাজনৈতিক ইসলামের গরল, তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে বঙ্গোপসাগরে।

সেদিন আমি থাকব না কিন্তু আমার অনেক শুভেচ্ছা থাকবে অঙ্গ-বঙ্গ-পুন্ড্র-সুম্ম-রাড়-গৌড়-সমতট-বরেন্দ্র-হরিকেলের সহজ সরল মানুষগুলোর জন্য।

মাভৈ!

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত