অপূর্ব সৌন্দর্য্য সোনাদিয়ার দ্বীপ

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৭, ১৭:২৪

সাহস ডেস্ক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে কক্সবাজার জেলার অপূর্ব সৌন্দর্য্য বেষ্টিত পর্যটন, কুতুবজোম ইউনিয়নের একটি বিছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়া। পৃথিবীর অন্যতম সমুদ্র সৈকতে কাছে হয়েও দ্বীপটি আজ অবহেলিত। সৃষ্টি শৈল্পিক আদলে গড়া কক্সবাজার জেলার পর্যটন শিল্পের আরেক সম্ভাবনাময় সৈকতের নাম সোনাদিয়া।

সোনাদিয়া কক্সবাজার জেলাধীন মহেশখালী উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ একটি দ্বীপ। দ্বীপটির আয়তন ৭ বর্গ কিলোমিটার। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নে সোনাদিয়া অবস্থিত। একটি খাল দ্বারা সোনাদিয়া মহেশখালী মূল দ্বীপ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। 

প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রশস্থ সৈকত, সৈকত ঘেষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ বালিয়াড়ি, জালের মতো ছোট-বড় অসংখ্য খাল বেষ্টিত ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ ল্যাগুন্যাল ম্যাডফ্ল্যাট, কেয়া-নিশিন্দার ঝোপ, বিচিত্র প্রজাতির জলচর পাখি সোনাদিয়া দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সমুদ্র সৈকতের পাশ ঘেষে অবস্থিত সোনাদিয়ার সুউচ্চু বালিয়াড়ির তুলনা বাংলাদেশে নেই। সমুদ্র এবং সৈকত থেকে বালিয়াড়ির দৃশ্য অপূর্ব মনে হয়। সোনাদিয়ার সৈকত এবং বালিয়াড়ি বিপন্ন জলপাই বর্ণের সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার উপযোগী স্থান। এখানে সামুদ্রিক সবুজ কাছিমও ডিম পাড়তে আসে। সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনারা ঘেষে বিচরণ করে লাল কাঁকড়া এবং প্যারাবন এলাকায় শীলা কাঁকড়া পাওয়া যায়।   

সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের তথ্য মতে সোনাদিয়া দ্বীপে মানব বসতির ইতিহাস আনুমানিক দেড়শ বছর থেকে। দ্বীপের মানুষেরা মূলত দুইটি গ্রামে বসবাস করে। সোনাদিয়া পূর্বপাড়া এবং সোনাদিয়া পশ্চিমপাড়া। দ্বীপটির বর্তমান লোকসংখ্যা প্রায় এক হাজার সাত শত। মাছ ধরা, মাছ শুকানো এবং কৃষিকাজ এই দ্বীপবাসীর মূল পেশা। অনেকেই আবার তাদের জীবিকার জন্য চিংড়ির পোনা ও শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের মতো পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় প্যারাবনের অবশিষ্টাংশ এখন মূলত শুধু সোনাদিয়া দ্বীপেই দেখা যায়। সোনাদিয়ার প্যারাবন বাইন বৃক্ষ সমৃদ্ধ। এছাড়া প্যারাবনে কেওড়া, গেওয়া, হারগোজা, নুনিয়া ইত্যাদি ম্যনগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়। প্যারাবনের ভেতরে সুন্দর বনের মত ছোট ছোট নদীর দু’পাশে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায়। সোনাদিয়ার প্যারাবন, চর, খাল ও মোহনা নানা প্রজাতির মাছ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। দ্বীপটির প্যারাবন সংলগ্ন খালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় যেমন- ভাটা, কোরাল, তাইল্যা, দাতিনা, কাউন, পোয়া ইত্যাদি। সাদা বাইন, কালো বাইন, কেওড়া, হরগোজা, নোনিয়াসহ প্রায় ত্রিশ প্রজাতির প্যারাবন সমৃদ্ধ উদ্ভিদ বিদ্যামান। মোহনা, চর ও বন ভূমিতে ঊনিশ প্রজাতির চিংড়ি, চৌদ্দ প্রজাতির শামুক, ঝিনুক নানা ধরনের কাকড়া (যেমন, রাজা কাকড়া, হাব্বা কাকড়া, জাহাজি কাকড়া, সাতারো কাকড়াসহ প্রায় আশি প্রজাতির সাদা মাছ, পঁয়ষট্টি প্রজাতির (বিভিন্ন প্রায়) স্থানীয় ও যাযাবর পাখি এবং কমপক্ষে তিন প্রজাতির ডলফিন দ্বীপটিতে বিচরণ করে থাকে। 

শীতকালে সোনাদিয়া দ্বীপে নানা ধরণের স্থানীয় ও পরিযায়ী জলচর পাখির আগমন ঘটে। চর, ল্যাগুন এবং খালের তীরে জলচর পাখির বেশি সমাগম ঘটে। এখানে ৭০ প্রজাতির জলচর পাখি পাওয়া যায়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময়ে সোনাদিয়ায় জলচর পাখি বিশেষত দেশি-বিদেশি কাদাখোচা পাখির মেলা বসে। লিটল প্রেটিংকল (Little Pratincle) সারা বছর ঝাঁকে ঝাঁকে সোনাদিয়ায় বিচরণ করে এবং বালুময় জায়গায় প্রজনন করে। অতি সম্প্রতি সোনাদিয়ায় বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন ৩ প্রজাতির কাদাখোচা যথা স্পুনবিল্ড স্যান্ডপাইপার (Spoonbilled Sandpiper), এশিয়ান ডোউইচার (Asian Dowitcher) এবং নর্ডম্যান্স গ্রীনশ্যাংক (Nordmans Green Shank) দেখা গিয়েছে। বুনো হাঁসের মধ্যে রাজহাঁস (Barheaded Goose), চকাচকি (Ruddy Shelduck) এবং খন্তেমুখা (Shoveller) অন্যতম।     

সোনাদিয়া দ্বীপকে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষার লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৪নং ধারার বিধান অনুসারে  ১৯৯৯ সালে সোনাদিয়া দ্বীপ ও পার্শ্ববর্তী ঘটিভাংগা মৌজার আংশিক এলাকা নিয়ে ইকোলজিকেলি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা ইসিএ ঘোষণা করে। ইসিএ ঘোষণার পর সোনাদিয়ায় পরিবেশের লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে।


কিভাবে যাবেন  

কক্সবাজার সদর হতে কস্তুরা ঘাট/ ৬নং ঘাটা/ উত্তর নুনিয়া ছড়া সরকারি জেটী ঘাট হতে স্প্রিট বোট বা কাটের বোটে করে সোনাদিয়া যাওয়া যায়।

বাণিজ্যিকভাবে কোরাল মাছ, বোল, ভাটা, তাইল্যা, দাতিনা, কাউন (কনর মাছ) ও প্যারাবন সমৃদ্ধ এলাকার অন্যান্য মাছগুলোর সরবরাহসহ সরকারিভাবে পর্যটনের ব্যবস্থা করলে দ্বীপের অবহেলিত মানুষের কর্ম সংস্থান হবে। সরকারি খাতে প্রচুর রাজস্ব আয়ও আসতো। দ্বীপবাসী সোনাদিয়া দ্বীপে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছেন। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত