প্রাচীন বাংলার এক সমৃদ্ধ জনপদের নাম বরেন্দ্রভূমি

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৭, ১২:৩২

 

১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম যখন এই দীঘি পরিদর্শন করেন তখন এর গভীরতা ছিল ১২ ফুট এবং প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ছিল ১২০০ ফুট। ধীবর দীঘির এই জয়স্তম্ভটি হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হিসেবে কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আজও দণ্ডায়মান। গ্রানাইট পাথরে তৈরি এরকম প্রাচীন স্তম্ভ বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। স্তম্ভটিতে কোন লিপি নেই। স্তম্ভের উপরিভাগ খাঁজকাটা অলঙ্করণ দ্বারা সুশোভিত। 

বৃটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে, একাদশ শতাব্দির কৈবর্ত্ত রাজা দিব্যকের ভ্রাতা রুদোকের পুত্র প্রখ্যাত নৃপতি ভীমের কীর্তি এটি। এ স্তম্ভের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতবিরোধ থাকলেও আজ অবধি দিব্যকের কীর্তি হিসেবে অত্র অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে।

ধারণা করা হয়, এই শাসনামলে পাল বংশকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে দীঘির মাঝখানে জয়স্তম্ভ স্থাপন করা হয়। এটি একটি অখণ্ড গ্রানাইট পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। স্তম্ভের চারটি কোন থাকার পাশাপাশি এই বিরাট স্তম্ভের উপরিভাগে পরপর তিনটি রেখা রয়েছে যা স্তম্ভটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। স্তম্ভটির শীর্ষে রয়েছে নান্দনিক কারু কাব্য যা রাজার স্মৃতিকে আজও অম্লান করে রেখেছে। এদিকে এ প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে আরও দর্শনীয় করে তুলতে স্থানীয়ভাবে প্রশাসনের সহায়তায় ডাকবাংলো, চিড়িয়াখানা, হোটেল ও পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেখানে পরিদর্শনে আসেন।

বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে নওগাঁ জেলার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই সঙ্গে নওগাঁ জেলা বাংলাদেশের পরিচিত একটি জেলা। প্রাচীন বাংলার এক সমৃদ্ধ জনপদের নাম বরেন্দ্রভূমি। অনেক দর্শনীয় স্থান, পর্যটন কেন্দ্র থাকলেও এই জেলায় আরও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইতিহাসকেন্দ্রিক স্থান। তার মধ্যে একটি দিবর দীঘি। নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলা থেকে ১৬ কি.মি. পশ্চিমে সাপাহার-নওগাঁ সড়কের পাশেই ঐতিহাসিক দিবর দীঘি অবস্থিত। দিবর দীঘির ঐতিহাসিক পটভূমি ছাড়াও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিশেষ ভূমিরূপ এবং আদিবাসী সাঁওতালদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অন্যতম।

ইতিহাস বলে দিবর বা ধীবর দীঘি নামে পরিচিত এই জলাশয় এবং জলাশয়ের মাঝখানে স্তম্ভটি একাদশ শতাব্দীর কৈবর্ত্ত রাজা দিব্যক, তার ভ্রাতা রুদোক ও রুদোকের পুত্র প্রখ্যাত নৃপতি ভীমের কীর্তি হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭১ খ্রি.) অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বরেন্দ্রভূমির অধিকাংশ অমাত্য পদচ্যুত সেনাপতি বরেন্দ্রভূমির ধীবর বংশোদ্ভূত কৃতী সন্তান দিব্যকের নেতৃত্বে পাল শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করেন। পরে দিব্যককে সর্বসম্মতিক্রমে বরেন্দ্রর অধিপতি হিসেবে নির্বাচন করা হয়। স্বল্পকাল পরে দিব্যক মৃত্যুবরণ করলে প্রথমে রুদোক ও পরে রুদোক-পুত্র ভীম সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই তিন কৈবর্ত্য বংশীয় রাজা ২৫-৩০ বছর বরেন্দ্র ভূমি শাসন করেন বলে জানা যায়। পরে দ্বিতীয় মহীপালের ভ্রাতা রামপাল ভীমকে পরাজিত ও নিহত করে পালরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। 

বাংলাদেশের এই প্রাচীন জয়স্তম্ভটি কোন কৈবর্ত্য রাজা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আজ অবধি তা সঠিক জানা যায়নি। একটি অখণ্ড পাথর কেটে তৈরি এই স্তম্ভের নয়টি কোণ আছে। এর এক কোণ থেকে আরেক কোণের দূরত্ব ১২ ইঞ্চি। এই বিরাট স্তম্ভের উপরিভাগে পর পর তিনটি বলয়াকারে স্ফীত রেখা আছে যা স্তম্ভের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এর শীর্ষদেশে আছে নান্দনিক কারুকার্য যা বাহ্যত মুকুটাকারে নির্মিত। বর্ণনা মতে, পানির উপরে স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট, পানির ভেতরে ১২ ফুট এবং মাটির নিচে সম্ভবত আরও ৮-১০ ফুট গ্রোথিত আছে।

ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ দিবর দীঘি, এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও কোন কমতি নেই। দীঘির মূল ঘাটে প্রবেশ করার সময় দু’পাশে দেবদারু গাছ দিয়ে ঘেরা রাস্তা আপনাকে স্বাগত জানাবে। দীঘির পাড়ে কয়েকশ’ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গাছের সমন্বয়ে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প এবং দীঘির পশ্চিম পাড়ে বিশাল আম-কাঁঠালের বাগান। দীঘির পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ দিকে রয়েছে দীর্ঘ খাঁড়ি। 

বর্ষার সময় বনের ভেতর দিয়ে খাঁড়ির প্রবাহ আপনাকে সুন্দরবনের কথা মনে করিয়ে দেবে। এই খাঁড়ি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আত্রাই নদীতে মিশেছে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিশেষ ভূমিরূপ। যা দেখতে হলে বরেন্দ্র এলাকা ঘুরতেই হবে। বরেন্দ্রভূমির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উঁচু-নিচু টিলার মতো বা ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ণ মাঠ যুগ যুগ ধরে কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত