সাকিবের বিস্ময়কর আউট, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় বাংলাদেশের

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২২, ১৭:৪৯

সাহস ডেস্ক

অন্যায় সিদ্ধান্তের শিকার হয়ে ফিরে যান অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। এরপর আর ঘুরে দাঁড়ানো হয়নি বাংলাদেশের। ১ উইকেটে ৭৩ রান থেকে মুহূর্তেই বাংলাদেশের স্কোর হয়ে যায় ৩ উইকেটে ৭৩! এরপর মাত্র ৫৩ রানে পড়ে যায় আরও ৫ উইকেট। শেষ পর্যন্ত নাজমুল হাসান শান্তর ফিফটিতে ৮ উইকেটে ১২৭ রান করে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। তবে এ লক্ষ্যটা পাকিস্তানের জন্য ছিল সাদামাটাই। তারপরও লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের হারাতে হয়েছে ৫ উইকেট, ১৯তম ওভার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। সাকিব আল হাসানের দলকে হারিয়ে দুই নম্বর গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনাল উঠে গেছে বাবর আজমের দল।

রবিবার (৬ নভেম্বর) অ্যাডিলেড ওভালে পাকিস্তানের কাছে ৫ উইকেটে হেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সপ্তম আসর থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। এ বিদায়ে আগামী অষ্টম আসরের বিশ্বকাপে খেলতে হলে বছাই পর্ব খেলতে হবে বাংলাদেশকে। এদিন একই মাঠে ছিল দুটি ম্যাচ এবং এক অর্থে দুটি ম্যাচই ছিল বাংলাদেশের। প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা হেরে গেলে বাংলাদেশের সেমিফাইনালে যাওয়ার পথ সহজ হবে। পরের ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে দিতে পারলেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত বাংলাদেশ। একই সমীকরণ পাকিস্তানের জন্যও ছিল।

একই মাঠে খেলা হওয়ায় এক টিকিটে দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশের সমর্থকেরা সকাল থেকেই মাঠে। উদ্দেশ্য, নেদারল্যান্ডস দলকে সমর্থন দিয়ে অনুপ্রাণিত করা। নেদারল্যান্ডস সমর্থন পেয়েছে পাকিস্তানের দর্শকদেরও। কারণ তাদের জন্যও সমীকরণটা ছিল একই, দক্ষিণ আফ্রিকা হেরে গেলে বাংলাদেশকে হারালেই সেমিফাইনালে চলে যাবে পাকিস্তান। বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের দর্শকদের সমর্থন নিয়ে শেষ পর্যন্ত বড় অঘটনই ঘটিয়ে দিয়েছে ডাচরা। তাদের ১৩ রানের জয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পরের ম্যাচটা হয়ে দাঁড়ায় কোয়ার্টার ফাইনাল, যে জিতবে সেই সেমিফাইনালে।

যে জিতবে সেই সেমিফাইনাল। এমন সমীকরণ ম্যাচে টসে জিতে আগে ব্যাটিং নিয়ে শুরুটা ভালোই হয়েছিল বাংলাদেশের। নাজমুল হোসেনের বাউন্ডারিতে শাহিন শাহ আফ্রিদির প্রথম ওভারেই ৬ রান। নাসিম শাহর পরের ওভারে পয়েন্ট দিয়ে নাজমুলের আরেকটি বাউন্ডারি, এই ওভারে ৭। আফ্রিদির করা তৃতীয় ওভারে আরেক ওপেনার লিটন দাস যে ছক্কাটা মারলেন, মনে হলো ভারতের বিপক্ষে আগের ম্যাচের ফর্মটাই হয়তো টেনে নিয়ে এলেন পাকিস্তান ম্যাচেও। তখন কে জানত, ওই ওভারের বিধিলিপিতেই বিদায় লেখা লিটনের! পঞ্চম বলটা সামনের পা একটু এগিয়ে স্ল্যাশ করতে গেলেন, কিন্তু শটটা জুতসই না হওয়ায় বল গিয়ে জমা পড়ে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের ফিল্ডার শান মাসুদের হাতে। দলীয় ২১ রানের মাথায় লিটনকে হারায় বাংলাদেশ।

লিটনের চলে যাওয়া অবশ্য টের পেতে দিচ্ছিলেন না নাজমুল ও তিনে নামা সৌম্য সরকার। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ফিফটি করা নাজমুলের ব্যাট থেকে এদিনও এসেছে ফিফটি, ৪৮ বলে ৫৪ রান। চতুর্থ ওভারে মোহাম্মদ ওয়াসিমের বলে ব্যক্তিগত ১১ রানে জীবন পেয়েছেন শাদাবের হাত থেকে, সেটি কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে সৌম্যর সঙ্গে নাজমুল গড়েছেন ৫২ রানের জুটি। ১৭ বলে ২০ রানের ইনিংসে সৌম্যকেও মনে হচ্ছিল আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু নাজমুলের সঙ্গে জুটি আর বড় করতে পারেননি। ১১তম ওভারে শাদাবের বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে ক্যাচ হয়ে ধরা পড়ে জুটি ভাঙেন সৌম্য সরকার। তার বিদায়ের পরের বলেই সাকিবের দুর্ভাগ্যজনক আউট, যেটা বদলে দেয় বাংলাদেশ ইনিংসের ছবিটাই।

১১তম ওভারেই শাদাব খানের বলে সৌম্য সরকার আউট হওয়ার পর উইকেটে এসেই প্রথম বলটাই ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে গিয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু শটটা ঠিকভাবে খেলতে পারলেন না। বল সাকিবের ব্যাট ছুঁয়ে বুটে লেগে চলে গেল। পাকিস্তানের বোলার-ফিল্ডারদের আবেদন সাড়া দিয়ে আম্পায়ার এলবিডব্লু দিয়ে দিলেন সাকিবকে। সঙ্গে সঙ্গেই রিভিউ নেন সাকিব। মাঠে তার শরীরিভাষাই বলে দিচ্ছিল, তিনি নিশ্চিত এলবিডব্লু হননি। টেলিভিশন রিপ্লেতেও পরিষ্কার দেখা গেছে সাকিবের ব্যাট অতিক্রম করার সময় সেটি ছুঁয়ে গেছে শাদাবের বল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে জিম্বাবুয়ের টিভি আম্পায়ার ল্যাংটন রুসেরে শেষ পর্যন্ত ফিল্ড আম্পায়ারের এলবিডব্লুর সিদ্ধান্তই বহাল রাখলেন।

ব্যাটের কোনা ছুঁয়ে বুটে লেগেছিল বল, তবুও সাকিবকে এলবিডব্লিউ দিলেন আম্পায়ার।

আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে মাঠেই বিস্ময় প্রকাশ করেন সাকিব। কারণ তিনি নিশ্চিত যে বল তার ব্যাট ছুঁয়ে তবেই বুটে লেগেছে। ওদিকে আম্পায়ারের নাকি মনে হয়েছে বল ব্যাটে লাগেনি, সরাসরি বুটে লেগেছে। আল্ট্রা এজে যেটা দেখা গেছে সেটা ব্যাট এবং মাটির সংঘর্ষের কারণে। যদিও পরে টিভি রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা গেছে, সাকিবের ব্যাট মাটিতে স্পর্শই করেনি। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তবু ডাগআউটে ফিরে যান সাকিব। অ্যাডিলেড ওভালের প্রেসবক্স ও কমেন্ট্রিবক্সেও বিস্ময়। বাংলাদেশের ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খান তো কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে দিয়েছেন, ব্যাট মাটির অনেক ওপরে ছিল। কাজেই ওটা ব্যাটের সঙ্গে মাটির সংঘর্ষ নয়। তিনি বুঝতে পারছেন না কেন সাকিবকে আউট দেয়া হলো! বিস্মিত পাকিস্তানের সাংবাদিকেরাও। এর আগে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেও আম্পায়ারিং নিয়ে অসন্তুষ্টি ছিল বাংলাদেশের। ভারতের ‘ফেক ফিল্ডিং’ সত্ত্বেও ৫ রান না পাওয়া, বৃষ্টির পর দ্রুত খেলা শুরু করে দেয়া; আপত্তি ছিল এসব নিয়ে। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হয়তো বড় কোনো আশা ছিল না বাংলাদেশের। তবু পর পর দুই ম্যাচে আম্পায়ারদের ‘ভুলে’র শিকার হওয়াটা অপ্রত্যাশিত। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ে তাই হারের যন্ত্রণার চেয়েও যেন বেশি হচ্ছে বঞ্চনার অনুভূতি।

এরপর আর দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন। অ্যাডিলেড ওভালের শুকনো খটখটে উইকেটে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানরা পারতেন রানটা দ্রুত বাড়িয়ে নিতে। সাকিব ফিরে যাওয়ার পর হাতে ছিল ৯ ওভার ১ বল। অথচ এই সময়ে রান এসেছে মাত্র ৫৪! সেটি আর ১০-১৫ বেশি হলেও হয়তো ম্যাচের চেহারাটা অন্যরকম হতো। ২০ বলে ২৪ রান করে এক আফিফ হোসেনের ব্যাটেই যা একটু চেষ্টা ছিল। শাহিনের বলে বোল্ড হওয়ার আগে মোসাদ্দেকের ১১ বলে ৫ রান, ৩ বলে কোনো রান না করে ওই ওভারেই নুরুল হাসানের ফিরে যাওয়া বাংলাদেশের ইনিংসের চাকাটাই দেয় থামিয়ে। কারও মধ্যেই দ্রুত রান বাড়িয়ে নেয়ার তাড়না দেখা যায়নি। অবশেষে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১২৭ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় সাকিব আল হাসানের দল। পাকিস্তানের হয়ে শাহীন আফ্রিদি একাই নিয়েছেন ৪টি উইকেট, ৪ ওভারে দিয়েছেন ২২ রান। শাদাব খান নিয়েছেন ২টি উইকেট এবং হ্যারিস রউফ ও ইফতিখার আহমেদ ১টি করে উইকেট নেন।

বাংলাদেশের দেয়া সাদামাটা লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের জুটিতে ৫৭ রান উঠলেও দুজন মিলে খেলেছিলেন ৬৩ রান। বাংলাদেশকে ছিটকে দিয়েছেন মূলত মোহাম্মদ হারিস। ১৮ বলে ৩১ রানের ইনিংস খেলার পথে নেওয়াজের সঙ্গে ২০ বলে ৩১ রানের পর শান মাসুদের সঙ্গে ১৪ বলে ২৯ রানের জুটি গড়েন হারিস। পাকিস্তান জয় পেয়েছে ১১ বল বাকি থাকতে, ৫ উইকেটে। এ হারে নেদারল্যান্ডসের নিচে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের হয়ে নাসুম আহমেদ, সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান ও ইবাদত হোসেন ১টি করে উইকেট নিয়েছেন। ম্যাচ সেরা হয়েছেন শাহীন আফিদ্রি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
আপনি কী মনে করেন করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপ সন্তোষজনক?