যেভাবে হলো গোল্ডেন GPA 5
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৪, ১১:৫০

আমি ১৯৯৯ সালে কারমাইকেল কলেজ থেকে রিটায়ার করার পর ২০০০ সালের শুরুতে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে জয়েন করি জেলা পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় একটা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তখন পর্যন্ত সেটি কলেজে উন্নীত হয়নি। যোগ দিয়েই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মন খারাপ হওয়ারই কথা। আমি পড়িয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর এখানে পড়াতে হবে স্কুল পর্যায়ের বাচ্চাদের। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম এই প্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা অসাধারণ রকম ট্যালেন্টেড। এমনকি প্লে-নার্সারি গ্রুপের ছেলেমেয়েরাও। গোল বাঁধে বার্ষিক পরীক্ষার পর। প্রত্যেকটা ক্লাসে ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী পর্যন্ত পরীক্ষায় প্রথম হয়। সমস্যা হলো কার রোল হবে ১। এ নিয়ে অভিভাবকদের সাথে স্কুলকর্তৃপক্ষের একটা দ্ব›দ্ব আগে থেকে চলে আসছিলো।
আমি যোগদান করেই পড়ে গেলাম এই ঝামেলার মুখে। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম পরীক্ষার রেজাল্ট হবে গ্রেডিং পদ্ধতিতে। (যেমন কোনো বিষয়ে ৯০ থেকে ১০০ নম্বর পেলে সেই বিষয়ের গ্রেড হবে অ+, ৮০ থেকে ৮৯ পর্যন্ত হবে অ, ৭০ থেকে ৭৯ পর্যন্ত অ-, এরকম আর কি। গ্রেড হলো সাতটা এবং সর্ব নিম্ন পাসমার্ক ৪০)। রেজিস্টারে নাম লেখা হবে নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী বর্ণানুক্রমিক। আলাদাভাবে ফার্স্ট-সেকেন্ড বলে কোনো কথা থাকবে না। একই গ্রেডের সবার পজিশন একই। আমার সিদ্ধান্তের সাথে কর্তৃপক্ষ একমত পোষণ করলেন। এ ঘটনা ২০০০ সালের।
এর ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ করা হলো গ্রেডিং পদ্ধতিতে। (এইচএসসিতে ২০০৩-এ)। পদ্ধতি এবং গ্রেড সংখ্যা অনেকটা একই মতো হলেও পাবলিক পরীক্ষার গ্রেডের পরিধি হলো ভিন্ন রকম। A+ এর পরিধি হলো ৮০ থেকে ১০০ নম্বর আর সর্বনিম্ন পাস মার্ক থাকলো পূর্বের মতোই ৩৩। প্রথম গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ (জিপিএ) গণনা করা হলো সব বিষয়ে, ৮০ এবং তদুর্ধ্ব নম্বর, জিপিএ- ৫।
শুরুতে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর জিপিএতে যোগ করার কোনো বিধান ছিলো না। চতুর্থ বিষয়ের নম্বর কেবল কাজে লাগতো উচ্চ শ্রেণিতে ভর্তির সময়। সারাদেশে প্রথম বার জিপিএ ৫ পায় মাত্র ৭৪ জন। এ নিয়ে অভিভাবক এবং পরীক্ষার্থীদের মধ্যে দারুণ হতাশা দেখা দেয়। অভিভাবকদের তিরস্কার আর নিজের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় অনেক মেধাবী ছাত্র হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যায়। এমনকি আত্মহননের মতো ঘটনাও ঘটে।
এরপর জিপিএ সিস্টেমে এক ধরনের পরিবর্তন আনা হলো। এবার জিপিএ নির্দ্ধারণে চতুর্থ বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চতুর্থ বিষয়ের মোট নম্বর থেকে দুই পয়েন্ট অর্থাৎ ৪০ নম্বর বাদ দিয়ে বাকী নম্বর জিপিএ নির্ধারণে যুক্ত হলো। ফলে এক বা একাধিক বিষয়ে ৮০-এর নিচে নম্বর পাওয়ার পরও বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেতে লাগলো। অনেকাংশে জিপিএ ৫-এর গুরুত্ব গেল কমে।
যারা সকল বিষয়ে ৮০ কিংবা ৮০-এর উর্ধ্বে নম্বর পেলো তাদের অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য নিজেরাই গোল্ডেন পাঁচ বলে গ্রেডে একটি আলাদা বিভাজন তৈরি করলেন। এটা এতো বেশি প্রচার পেলো যে এই বিভাজন যে সরকারিভাবে অনুমোদিত নয় তা প্রায় অজানাই থেকে গেল অনেকের কাছে।
পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর সবার নজর যায় তথাকথিত গোল্ডেন পাঁচের দিকে। সাধারণ পাঁচ পাওয়াদের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় তারা এক প্রকার হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে।
এসময় গ্রেডিংয়ে আরও একটা সংশোধনী আনা হলো । এর আগে গ্রেড এ থেকে বি গ্রেডের রেঞ্জের ব্যবধান ছিলো অন্যান্য গ্রেডের তুলনায় অনেক বেশি। ৫০ থেকে ৬৯ নম্বর। এই ব্যবধান অন্যান্য গ্রেডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এখানে A- বলে নতুন একটি গ্রেড যুক্ত করা হলো।
এরপর সমস্যা বাঁধলো আর একটা জায়গায়। উচ্চ শিক্ষা কিংবা চাকরি ক্ষেত্রে আবেদন করতে গিয়ে বাঁধলো বিরোধ। সনাতনী পদ্ধতিতে যে রেজাল্ট (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ) এবং ২০০১ সন থেকে ২০০৩ সন পর্যন্ত যে জিপিএ পদ্ধতির রেজাল্ট, তার সাথে পরবর্তী কালের রেজাল্ট কীভাবে সমন্বিত হবে তা নিয়ে দেখা দিলো সমস্যা। এই সমস্যা আরও জটিল করে তুললো দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তারা ভর্তির সময় বিচ্ছিন্নভাবে এক একবার এক এক শর্ত আরোপ করতে লাগলো। এই সুযোগ গ্রহণ করলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তাদের বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠলো। বিদ্যা হয়ে উঠলো বাণিজ্যের উপকরণ।
২০০৯ ও ২০১০ সালে শিক্ষামন্ত্রণালয় দুইবার দুটো প্রজ্ঞাপন জারি করলো। ২০০৯ সালের ২ জুনে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হলো ৪ বা তদূর্ধ্ব জিপিএ সমান হবে প্রথম বিভাগ, ৩ থেকে ৪-এর কম দ্বিতীয় বিভাগ এবং ১ থেকে ৩-এর কম তৃতীয় বিভাগ। এর পরের বছর ২০১০ সালের ২ মার্চ শিক্ষামন্ত্রণালয় জারি করলো আর একটি প্রজ্ঞাপন। যাতে বলা হলো অর্জিত জিপিএ ৩ বা তার ঊর্ধ্বে হবে প্রথম বিভাগ, ২ থেকে ৩-এর কম দ্বিতীয় বিভাগ এবং ১ থেকে ৩-এর কম হবে তৃতীয় বিভাগ।
লক্ষ করলে দেখা যাবে এই সমন্বয়ে বড় ধরনের একটা ত্রুটি থেকে গেল। সনাতনী পদ্ধতিতে ৬০ নম্বর থেকে তদূর্ধ্ব ছিলো প্রথম বিভাগ আর উপর্যুক্ত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রথম বিভাগ শুরু হলো ৫০ নম্বর থেকে। অনুরূপভাবে সনাতনী পদ্ধতিতে ৪৫ থেকে ৫৯ নম্বর ছিলো দ্বিতীয় বিভাগ, জিপিএ পদ্ধতিতে তা শুরু হলো ৪০ নম্বর থেকে। তৃতীয় বিভাগের উল্লেখ নাই বা করলাম।
এভাবে যখন যে সমস্যা সামনে এসেছে অনেক ক্ষেত্রে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করা হলো জোড়াতালি দিয়ে। ফলে দিনে দিনে ভুল-ভ্রান্তি জটিল আকার ধারণ করলো। এখন এই জটিল অবস্থা থেকে বেরিয়ে একটি সুসমন্বিত ব্যবস্থায় পৌঁছা একরূপ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটা হাসির কথা বলি, যে বছর পাশের হার এবং জিপিএ পাঁচের হার দৃষ্টিকটুভাবে বেশি হয় তখন বলা হয় শিক্ষাব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে তাই পরীক্ষার ফলেও এমন উল্লম্ফন ঘটেছে আর যদি কম হয় তখন বলা হয় পরীক্ষা খুব সস্তা হয়ে গিয়েছিলো, একেবারে যা তা, তাই এবার পরীক্ষা বেশ কঠিন করা হয়েছে, এবার আসল মেধার সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে।
© শ্রদ্ধেয় শিক্ষক Mazhar Mannan স্যারের লেখা হতে































